আমরা ঢাকার মিরপুরে জন্মেছি। কিন্তু আমাদের দাদা বাড়ি, নানা বাড়ি সবই বরিশালের বাকেরগঞ্জে। আব্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ষাটের দশকের শেষ ভাগে তার সরকারি চাকরিতে যোগদান। প্রথমে আজিমপুর কলোনিতে থাকার অ্যালোটমেন্ট পান। কিন্তু তিনি বেছে নেন ৭০ এর দশকের শুরুতে মিরপুর দুই নম্বরের ছোট্ট বাসার এক লাল রঙের কলোনি। স্কয়ার ফিটের হিসেব তো জানি না। আমাদের লাল বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাটকে এক চৌকি পাতা ঘরই বলা যায়।
৭৬ পরবর্তী সময়ে আম্মার সাথে বন্ধন। বাকেরগঞ্জে জন্ম নেওয়া আগে পরিচয় না থাকা দুই মানব-মানবীর ঠিকানা এরপর থেকে মিরপুর। তাদের ভালোবাসার মিশ্রণে সিক্ত হয়ে আমাদের দুই ভাইয়ের পৃথিবী দেখা। এর মধ্যে অনুজ আমার জন্ম আশির মাঝামাঝি।
তখনও মিরপুরের অপরূপ বিল, ঝিল, পুকুর, নদ তুরাগ আর বিস্তৃর্ণ ফাঁকা থাকা প্রান্তর দেখতে দেখতে আমরা বড় হই। পাকিস্তান আমলে আব্বার পাওয়া মাসিক বেতনের অর্ধেক দিয়ে তখনের ঢাকার অনেক জায়গায় জমি কেনা যেত। নানা কারণেই তার পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। আমৃত্যু এ নিয়ে আব্বার মধ্যে কোনো আফসোসও দেখিনি। কিন্তু আমাদের আর “ঢাকাইয়্যা” হওয়া হয় না। ডাইলে লবণ দেই আর না দেই আমরা “বরিশাইল্যা” হয়েই থাকি। বরিশাল, বাকেরগঞ্জ বিযুক্ত হতে পারি না। স্কুলের নার্সারিতে ভর্তি হওয়ার সময় থেকে স্থায়ী ঠিকানার ঘরে লিখতে হচ্ছে দাদা বাড়ির ভিটার বৃত্তান্ত।
বাকরখানী দারুণ টেস্টি বুঝি। কিন্তু জমিদার সাহেব আগা বাকের খানের মর্জি তো বুঝি না। অন্য এত জায়গা রেখে কেন ১৭৪১ সালে আমাদের পূর্বপুরুষদের জনপদে তিনি গঞ্জ স্থাপন করেন তার উত্তর কী? আর কেনই বা তার প্রভাব? ১৮০১ সালে বাকেরগঞ্জ জেলায় সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। সদর দপ্তর বরিশাল হলেও জেলার নাম ‘‘বাকেরগঞ্জ’’ই বহাল থাকে।
আমরা ছোটবেলায় বাকেরগঞ্জ কম যেতাম। বরিশাল বেড়াতে গেলে উঠতাম লঞ্চঘাটের খুব কাছে ভাটার খালে। সেখানে সেজ চাচার বিশাল টিনের চালের ছায়া ঢাকা সরকারি কোয়ার্টার। দাদিও সেখানে থাকতেন। অনেক গাছের সে বাসা। দাদি সোনাবরু ছিলেন আমাদের ফল পাড়বার সর্দারনী। আমরা কাজিনরা গাছে উঠলে তিনি লম্বা বাঁশের লাঠি এগিয়ে দিতেন। আবার পড়ে টড়ে যাই কিনা সে নিয়েও তার উদ্বেগ। বৃদ্ধা শরীরে আমাদের ক্যাচ ধরার জন্য তিনি গাছের গোড়া জাপ্টে থাকতেন। এরপর ধুয়ে, কেটে ফলাহার। আমাদের সম্মিলিত হাহাহিহি। আহা শৈশব!
বরিশালের কীর্তনখোলাযুক্ত অনেক খালের মতোন ভাটার খালও ভরাট হয়েছে। স্রোতময়তা পদতলে পিষে এখন রাস্তা মিশেছে সদর রোডে। দাদী, সেজ চাচা আর আব্বাও মিশে গেছেন মাটিতে। আমরা অদেখা ভূবনে তাদের ফিরে চাওয়ায় দোআয়রত।
“ আমরা সবাই তাঁর কাছেই ফিরে যাব ”
: সুরা বাকারাহ : ১৫৬
সেজ খালাম্মীর বাসা ছিল বগুড়া রোডে। সেখানেও থাকা হতো। ছোটবেলায় আব্বা বারবার বগুড়া রোড নিয়ে কথা বলতেন। কখনও রিকশায়। কখনও হাঁটতে হাঁটতে। সেখানে না কী কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়ি ছিল। কবি তখনও ভর করেননি। কিন্তু কবির মা’কে চেনা হয়েছে। কুসুমকুমারী দাশের “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে।” কবিতা সম্ভবত ক্লাস ফাইভের দিকে সিলেবাসে ছিল।
জীবনানন্দ দাশকে ঘিরে বিস্ময় সৃষ্টি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এর আগ পর্যন্ত বুঝতাম ‘‘সাইন্স’’ একটা আলাদা সাবজেক্ট। আর ‘‘বাংলা’’ আরেক। আর কবিতা তো আরও ভিন্ন। কিন্তু এই কবি সব গুলিয়ে দিলেন এক লাইনেই (“নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে”)
“ . . .
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
...”
: আকাশলীনা, সাতটি তারার তিমির
বুঝতে পারি চাঁদ পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তনকারী এক উপগ্রহ। যার নিজের আলো নেই। আলো দেখি আমরা নক্ষত্রে। আমাদের সৌরজগতের কক্ষপথে নক্ষত্র হচ্ছে সূর্য। সূর্যের আলো চাঁদে পড়ে। আমরা পৃথিবী গ্রহবাসী একেই জোছনা বলি।
এই এত এত মহাজাগতিক বিষয় এক লাইনে লিখতে পারা কবি “বরিশাইল্যা” জেনে গর্ব লাগে। বগুড়া রোডের জন্য তো আরও। একের পর এক হুমায়ূন আহমেদ পড়তে পড়তে দেখি উপন্যাসের নাম থেকে শুরু বহু কিছুতে এ কবির হাতছানি। হিমু বেনসন ধরাতে ধরাতে জীবনানন্দ দাশ আওড়ায়। আর মিসির আলি মানেই তো করোটিতে বিপন্ন বিস্ময়।
‘‘লীলাবতী’’ উপন্যাসের উপসর্গপত্রে হুমায়ূন আহমেদ তো লিখেই গেছেন,
“শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ
কবি, আমি কখনো গদ্যকার হতে চাই নি। আমি আপনার মতো একজন হতে চেয়েছি।
হায়, এত প্রতিভা আমাকে দেয়া হয়নি! ”
হুমায়ূন আহমেদকে অনেকে সস্তা মনে করেন। সে তাদের ইচ্ছা। কারও মনে করবার স্বাধীনতায় কর্তৃত্ব ফলানোর কী? কিন্তু বাংলা সাহিত্যে ‘‘আধুনিক কবি’’ বলতে যাদের চেনানো হয়, তারা সবাই দাশবাবু দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কথাশিল্পীদের রাস্তা একই। কেউই কবি জীবনানন্দ দাশকে উপেক্ষা করতে পারেননি। উল্লেখ করতে পারি, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক থেকে এখনের দুর্দান্ত শাহাদুজ্জামান পর্যন্ত।
জীবদ্দশায় বিবরবাসী কবিকে নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন। তার কীর্তি অনুদিত হচ্ছে নানা ভাষায়। কিন্তু যে বরিশালের বগুড়া রোডের সর্বানন্দ বাড়িতে তার জন্ম সেই শহরে জীবনানন্দ কতটুকু বিরাজিত?
লঞ্চঘাটে কাউকে জিজ্ঞেস করলে চেনেন না। শহরে ঢুকতে ঢুকতে কোনো স্মৃতি দেখিনি তার। সিটি করপোরেশন বগুড়া রোডের নামকরণ করেছে ‘‘জীবনানন্দ দাশ সড়ক’’। ব্যস! দায় যেন খালাশ। এত এত দোকানের মধ্যে খুব কমেই নতুন নামকরণ দেখেছি। বরিশালের ব্রাহ্ম সমাজের ঐতিহ্যবাহী কবির বাড়িটি পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি এই রাষ্ট্র। পাশের ভবনে ‘‘জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার’’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অধিকাংশ সময় তা থাকে বন্ধ। ১৯৩৫ সালেও জীবনানন্দ দাশ কলকাতা থেকে ফিরে আবার ব্রজমোহন কলেজে (বিএম) শিক্ষকতায় যোগ দেন। এর পরের বছর তার পুত্র সমরানন্দের জন্ম এই বরিশালে।
জীবনানন্দের কবিতায় বাংলার প্রকৃতি মানে বরিশালেরই প্রকৃতি। এর ঝিঁঝিঁ ডাকা নির্জনতায় তিনি কবিতার ‘‘ক্যাম্প’’ ফেলেছেন। এ শহরের বিস্তৃত মাঠে তার কল্পনার মহীনের ঘোড়াগুলি চড়েছে। দূষণহীন মুক্ত বাতাস তাকে নক্ষত্রমুখী করেছে।
কিন্তু আজকের বরিশালে দৃশ্যমান একটি মাত্র পরিবারের রাজত্ব। দেশকর্তার পরম আত্মীয় তারা- এই তাদের পরিচয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তাদের জমিদারি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার দাপটে এদের হাতে প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীলরা পর্যন্ত জিম্মি। প্রশাসন বনাম সিটি করপোরেশন বিরোধের খবর কয়েক মাস আগেও সংবাদমাধ্যমে জানতে পাই। এই ক্ষমতার স্তাবক সাংস্কৃতিক রুচিহীন গোষ্ঠীর হাতে কবি জীবনানন্দ দাশ দফায় দফায় রক্তাক্ত হচ্ছেন লাশ কাটা ঘরে।
শুধু মাত্র জীবনানন্দ দাশকে ঘিরেই তো হতে পারত নতুন বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। নদী জড়ানো এ ভূমিতে পর্যটন বাণিজ্য নতুন মাত্রা পেতে পারত। কেবল নরেন্দ্র মোদি মত্ততায় নয়, সত্যিকারের বাংলাদেশ ভারত সাংস্কৃতিক মৈত্রীর সেতু হতে পারত গর্বের এ জনপদ।
আমরা আমাদের হারানো শৈশবের আনন্দের এক টুকরো খোঁজে স্মৃতিময় বরিশাল, বাকেরগঞ্জমুখী হই। কিন্তু দেখতে পাই জীবনে আনন্দ নেই। পায়রায় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধোঁয়ায় আত্মার মর্মমূলে থাকা জীবনানন্দ দাশও পালাতে বাধ্য হবেন।
এবার খেয়াল করলাম কীর্তনখোলা আর বুড়িগঙ্গার পানির খুব বেশি তফাত নেই। ‘‘শুভ রাষ্ট্র’’ কি কোনো দিন দেখে যেতে পারব? তখন কবির অগ্রন্থিত কবিতা ‘‘জীবন ভালোবেসে’’র এই দুই লাইন ছাড়া আর কিছু মনে আসে না।
“ . . .জীবন ভালোবেসে হৃদয় বুঝেছে অনুপম
মূল্য দিয়ে আসছে চুপে মৃত্যুর সময়।”
লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



