Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল স্মরণে আছেন, চেতনায় আছেন কি?

সমাজে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় জাতীয় বিবেকবোধ ও নাগরিক দায়িত্বশীলতা সৃষ্টিতে কবি সুফিয়া কামালের অবদান সবার জন্য অনুসরণীয়। প্রয়াত কামাল লোহানী তো জোর দিয়ে বলে গেছেন অনুকরণীয়

আপডেট : ২০ জুন ২০২৩, ১২:৫৮ পিএম

গত বছর কবি সুফিয়া কামালের প্রয়াণ দিবসে উপরোক্ত শিরোনামে লিখেছিলাম একটা জাতীয় দৈনিকের জন্য। সম্পাদকের কলমে শুরুর একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায় এবং শিরোনাম পরিবর্তিত হয়ে সেটা প্রকাশিত হয় পত্রিকাটির অনলাইন ভার্সনে। 

একই শিরোনামে এ বছর কবির জন্মদিনে আবারও লেখার কারণ হলো, আমি এই আলাপটা সামনে আনতে চাই। জন্মজয়ন্তী উদযাপন এবং প্রয়াণ দিবসে কবিকে স্মরণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আমরা নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলছি। কবি সুফিয়া কামালের চেতনা আমরা অন্তরে লালন করতে পারছি না, ছড়িয়ে দিতে পারছি না পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নারী অধিকার এবং ধর্ম সব ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।

আবুল আহসান চৌধুরীর নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি বলিছিলেন, “আমি নানার বাড়িতে মানুষ। তারা ছিলেন সেকালের নবাব পরিবার। ওখানে তাদের হালচাল, চালচলন, শিক্ষা-দীক্ষা সব অন্যরকম ছিল। তাদের ভাষা ছিল উর্দু। পারিবারিক পরিবেশ ছিল সেই আগেকার দিনের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মতোই মর্যাদাশীল। আমি সেই আবহাওয়ার মধ্যে মানুষ হয়েছি। মেয়েরা বাংলা-ইংরেজি লেখাপড়া কিছুই জানতেন না। তবে আরবি-ফার্সি-উর্দু এসবের চল ছিল। আমাদের পরিবারে বাংলা ভাষাটা ছিল না। আমার মা-ই আমাকে বাংলা শেখান।”

আরবি-ফার্সি-উর্দু ভাষা পরিবেষ্টিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা কবি সেই ছোটবেলা থেকেই রচনা করেছেন কত অনন্য কবিতা। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা যারা প্রতি বছর কবিকে স্মরণ করি, তাদের অনেকের সন্তানদের কাছেই বাংলা ব্র্যত্যজনের ভাষা। এখন জাতে ওঠার ভাষা একটাই, সেটা হলো ইংরেজি। পাশাপাশি কথিত শিক্ষিত সমাজের মধ্যে এমনকি নিজেদের অগ্রসর দাবি করা মানুষের মাঝেও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বাড়ছে আরবি শব্দের ব্যবহার। 

অনেক ডাক্তারই তাদের প্রেসক্রিপশনে রোগী দেখার সময় উল্লেখ করছেন নামাজের সময়ের নাম উল্লেখ করে। যেমন- “আসরের নামাজের পর”। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তনদের সভা আহ্বান করা হচ্ছে, “শুক্রবার বাদ জুমা”। এমনকি সম্প্রতি একটা প্রগতিশীল পরিবারে একজনের  নিমন্ত্রণপত্রে সময় উল্লেখ করা হয়েছে নামাজের ওয়াক্ত উল্লেখ করে। আছর, জোহর এবং এগুলোর শুরু-শেষ কি দেশে বসবাসরত অমুসলিম সম্প্রদায়ের সব মানুষের কাছে বোধগম্য?  

কবি নিজেও আক্ষেপ করে বলেছেন, “আমারও সেটাই জিজ্ঞাসা। এই যে বাঙালি এরকম হয়ে গেল কেন? কীসের জন্য? এই বাঙালি খালি হাতে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রাণ দিল, ভাষা আন্দোলন করল-দেশকে স্বাধীন করল। সেই বাঙালির আজকে এত অধঃপতন কেন? সেটিই তো আমার জিজ্ঞাসা।”

এ কথা যে তিনি শুধু ভাষার প্রতি বাঙালির অবজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন তা নয়; বরং বাঙালির সামগ্রিক অধঃপতন সম্পর্কে, ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবির এই আক্ষেপ। 

সমাজে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় জাতীয় বিবেকবোধ ও নাগরিক দায়িত্বশীলতা সৃষ্টিতে কবি সুফিয়া কামালের অবদান সবার জন্য অনুসরণীয়। প্রয়াত কামাল লোহানী তো জোর দিয়ে বলে গেছেন অনুকরণীয়। 

তার অনন্য ও সাহসী ভূমিকা শিরোনামে লেখায় কামাল লোহানী বলছেন, “কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক।” দলগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। আজকের দিনে আমরা কী দেখছি, ধর্মনিরপেক্ষ মুখের আড়ালে সব সাম্প্রদায়িক মন নিয়ে বিনা বাক্যব্যায়ে স্বাধীনতার কথিত চেতনাধারীদের দলদাসে পরিণত হয়েছে শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের বড় অংশ। 

পাকিস্তান আমলে এনএসএফ-এর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শারীরীকভাবে আক্রমণের শিকার হওয়া এবং সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে সুফিয়া কামাল যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বৈরশাসকদের কিছু বলার না থাকায় আইয়ুব খান বার্মায় সেনাবাহিনী কর্তৃক পেশিশক্তির মাধ্যমে ছাত্র আন্দোলন বন্ধের উদহারণ দেন। জবাবে সুফিয়া কামাল অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলেন, “এ ধরনের বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটাই যদি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য হয় তবে বৈঠক চালিয়ে কোনো লাভ নেই।” তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠক থেকে বিদায় নেন। 

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ এমন একজন নাগরিক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 

অধ্যাপক আসিফ নজরুলের একটা লেখা পড়েছিলাম, তখন বিএনপি ক্ষমতায়। যতদূর মনে পড়ে লেখাটা ছিল এ রকম, “আজ একটা প্রোগ্রামে লিয়াকত শিকদারের সাথে দেখা। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, লিয়াকত এখন কোথায় থাক? উত্তরে ও জানালো, সেটা ঠিক করি রাত ১০টার পর।”

অধ্যাপক আসিফ নজরুল এরপর লিখেছেন, “আমি যদি খালেদা জিয়াকে বলি, লিয়াকত শিকদার কেন হলে থাকতে পারবে না? খালেদা জিয়া হয়ত বলবেন, কেন আওয়ামী লীগের আমলেও তো আমার লাল্টু-পিন্টুরা হলে থাকতে পারেনি।”

টানা তিনবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী একজন শিক্ষকেরও আজ এতটুকু কথা বলার মতো সাহস আছে বলে মনে হয় না। আজও আমাদের শিক্ষক সমাজ, আমাদের সাংবাদিক সমাজ কবি সুফিয়া কামালকে স্মরণ করেন , তাকে নিয়ে লেখেন। কিন্তু তার চেতনাকে ধারণ, কর্মকে অনুসরণের জায়গায় তাদের দারুণ দ্বিধা। 

কারণ এই স্বাধীন বাংলাদেশে কবি সুফিয়া কামালের মত সাহসিকতার পরিচয় দিতে গেলে শাসকের তো বটেই, শাসনক্ষমতার বাইরে যারা কথিত সংখ্যাগুরু তাদের রোষানলে পড়ারও সম্ভাবনা দারুণ। 

সেটা তো আমরা মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামালের ক্ষেত্রেও দেখেছি।  

১৯৯১ সালে এক সাক্ষাতকারে কবি বলেছেন, “কোনো দলের রাজনীতি আমি করি না। সত্য প্রকাশে যা বাধা দেয়, মানবতার লাঞ্ছনা যেক্ষেত্রে হয়, আমি  তখন চুপ থাকতে পারি না। আমার বিবেক আমাকে তাড়িত করে। সেজন্য সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে জড়িত থেকেও যখন যা নিজেকে আঘাত করেছে তার প্রতিবাদ করেছি।”

মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার মেরুদণ্ড প্রবন্ধে লিখেছেন, “গৃহ-নির্মাণে গৃহস্বামীর যে স্থান রাষ্ট্রগঠনের ব্যাপারেও কবি-সাহিত্যিকদের সেই স্থান। গৃহস্বামীর ইচ্ছা, অভিরুচি, খেয়াল ও কল্পনার খোঁজ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার গৃহের প্ল্যান বা পরিকল্পনা করেন; পরে ওভারশিয়ার, রাজমিস্ত্রি ও যোগালির সহায়তায় গৃহনির্মাণ কার্য্য সমাধা করেন। রাষ্ট্রও এ-ভাবেই গঠিত হয়। রাষ্ট্রে বাস করে জীবন। জীবন মুক; তার প্রতিনিধি কবি ও সাহিত্যিক-জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিচিত্র সাধ ও গভীর অভীপ্সা এদের মারফতেই অভিব্যক্ত হয়।”

গৃহনির্মাণ ও রাষ্ট্রগঠন দুই জায়গাতেই কবি সুফিয়া কামাল যথাযথ ভূমিকা রেখেছেন। ধানমন্ডিতে কবির বাড়ি “সাঁঝের মায়া”র পরিবেশ এবং স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী বাংলাদেশে কবিতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ এবং রাজনীতিতে তার ভূমিকা চর্চা করলে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে শুরলে বুঝতে বাকি থাকে না।

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর একই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “ব্যক্তির জীবনে শিরদাঁড়ার যে স্থান, জাতির জীবনে রাজনীতির সেই স্থান। শিরদাঁড়া ছাড়া ব্যক্তি চলতে পারে না। আর রাজনীতি ছাড়া জাতি অচল। তথাপি মাত্রাজ্ঞানহীন মেরুদণ্ডের সাধনা যেমন ব্যক্তির পক্ষে মারাত্মক, মাত্রাজ্ঞানহীন রাজনীতির সাধনাও জাতির পক্ষে অশুভ। কেননা, উভয়ক্ষেত্রেই সোউন্দর্য্য নষ্ট হয়ে আত্মা বিকৃত হয়ে যায়।”

আমার মনে হয় কবি সুফিয়া কামাল এই বক্তব্য মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাই যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানবতার বিপক্ষে গেছে, মানবাধিকারের বিপক্ষে গেছে সেটা যত বড় নেতার পক্ষ থেকেই আসুক না কেন, তিনি তার বিরোধিতা করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিরদাঁড়া সোজা রেখেই। ইতিহাস তার সাক্ষী। 

কিন্ত আজকের বাংলাদেশে কবি সুফিয়া কামালের মতো ভূমিকায় আমরা কি কাউকে দেখতে পাচ্ছি, যিনি এই মাটিতে থেকে মাটিসংলগ্ন মানুষের কথা বলবেন নিরন্তর?

কবি সুফিয়া কামালকে নিয়ে এরকম অসংখ্য প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাবে। তিনি নিজের সময়ে যে ভূমিকা রেখে গেছেন, সমকালীন বাংলাদেশে সেই ভূমিকা রাখতে আমরা ব্যর্থ, সেকথা অস্বীকার করার বোধহয় কোনো অবকাশ নেই। তাই কবি আমাদের স্মরণে আছেন, চেতনায় নাই এই বক্তব্যও  অমূলক হবে না। 

জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের ১১২তম জন্মদিনে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার, কবি স্মরণের সাথে সাথে তার চেতনাও আমরা হৃদয়ে লালন করব। জন্মজয়ন্তীতে কবিকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলী।


মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links