বাংলা ভাষার সীমানা মানে হুমায়ূন আহমেদ পরিবার - এ কথা কি অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলা? উত্তর নিজেকেই খুঁজতে হয়। টিভি নাটকের চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল হয়েছে বাংলাদেশে। জোছনায় মোহিত হওয়ার দর্শন দেখানোর কীর্তি হুমায়ূনের। এ দেশের একটি পৌরসভায় চাঁদনী রাতে স্ট্রিট লাইট নিভিয়ে দেওয়া হতো। বৃষ্টিতে ভিজে উল্লাস করার প্রবণতাধারী হুমায়ূন নিজে। “হিমু” সৃষ্টি করে তিনি পরিনত হয়েছেন কাল্ট ফিগারে।
বাংলাদেশের তরুণ কিশোররা ব্যাপকমাত্রায় প্রভাবিত হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও পাঠকপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল দ্বারা। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণ, শাহবাগ আন্দোলন থেকে এখনের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের “ভিসি” পদধারীকে তাড়াতে তাকেই পদক্ষেপ নিতে হয়।
এই পরিবারের আরেক কীর্তিমান দেশখ্যাত কার্টুনিস্ট, লেখক, গ্রাফিক নভেল শিক্ষক ও স্যাটায়ার ম্যাগাজিন “উন্মাদ” এর সম্পাদক আহসান হাবীব। চার দশকের বেশি সময় বাংলাদেশ হাসে “উন্মাদ” পড়ে।
এই নক্ষত্রসমদের ডিএনএবাহী পিতার নামই শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি এই আদর্শ মানুষটির জন্মদিন। আমাদের জাতীয় পতাকার লালে মিশে আছে যার রক্ত। পুরো একটি পরিবারকে জননন্দিত শিল্প সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করার কৃতিত্ব এই বাবার।
শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এর স্ত্রী হুমায়ূন মাতা আয়েশা ফয়েজকে তুলনা করা যায় এক ফিনিক্স পাখির সাথে। ৭১ এ পরিবারের প্রধানকর্তাকে হারানোর পর এই গৃহবধূ মায়ের সংগ্রাম অনন্য। তার লিখিত বই "জীবন যে রকম" তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে জনপদে। ২০১১ সালের ১০ ডিসেম্বর বণিক বার্তায় কর্মকালে মিরপুরের পল্লবীতে খালাম্মার ইন্টারভিউ করার সৌভাগ্য হয়। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন সে সময়টায়। কথা বলেন প্রায় ২০ মিনিটের মতোন। এ অল্প সময়ে আমি বুঝতে পারি হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আহসান হাবীবদের সৃষ্টিকর্ম গর্ভসূত্রে পাওয়া। ফয়জুর রহমান আহমেদ ও আয়েশা ফয়েজের শিক্ষায়ই জীবনপথে বিচ্যুত হয়নি কোনো সন্তান। অধ্যাপক সুফিয়া হায়দার, মমতাজ আহমেদ শিখু ও রুখসানা আহমেদ এ দম্পতির কন্যাত্রয়। তারাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল।
শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদের জীবন সবচেয়ে বেশি প্রামাণ্য তার মেয়ে অধ্যাপক সুফিয়া হায়দার লিখিত “আমার দুঃখী বাবা” বইয়ে। এ যেন এক মর্মস্পর্শী শোকগীতি। বইটির পাঠ শেষে বেদনা ছুঁয়ে যাবে যে কাউকে। যে বাবাকে নিয়ে লিখিত এই বই তাকে আপন মনে হবে বাংলা জনপদের যেকারো। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদকে “স্বাধীনতা পদক” এ ভূষিত করে। এ শহীদ বুদ্ধিজীবীর ছবি সমন্বিত ডাক টিকিটও প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়াত এই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে তার শেষ কর্মস্থল পিরোজপুর পুলিশ লাইনে ম্যুরাল নির্মাণ করে একটি শহীদ বেদি স্থাপন করা হয়েছে। পিরোজপুর সদর উপজেলায় তার নামে হয়েছে “শহীদ ফয়জুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব”। শহীদের জন্মভূমি নেত্রকোনায় তার নামে সড়ক আছে। তার নিজ গ্রামে আছে “শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ” নামে স্কুল।
কিন্তু চলে যাওয়ার পরে এত প্রাপ্তি নিয়েই “দুঃখী” বাবাকে নিয়ে লেখা বইয়ের শেষে অধ্যাপক সুফিয়া হায়দার লিখেছেন, “ আমার বাবা একজন সত্যিকারের দুঃখী মানুষ ছিলেন। খুব ছোট্টবেলায় বাবা-মা ছেড়ে বহু দূরে একা একা জায়গির থেকে পড়াশোনা করেছেন। বিএ পাস করার পর এমএ পড়ার খুব শখ ছিল, অর্থের অভাবে পারেননি। শেরে-এ-বাংলার ডাকে শিক্ষকতার জীবন বেছে নিয়েছিলেন, বেতন পাননি। পরে জীবন ধারণের তাগিদে পুলিশের চাকরি নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সাহিত্য খুব ভালোবাসতেন, জানতেও পারেননি তার ছেলেরা দেশের বরেণ্য লেখক হতে পেরেছে। খুব সামান্যতে সুখী ছিলেন বাবা, প্রায়ই আবৃত্তি করতেন ‘ধন নয় মান নয় এতটুকু আশা . . .’ মাঝে মাঝে ভাবি জীবনে তিনি তো কিছুই পাননি। মরণের পরে এত প্রাপ্তি দিয়ে তার কী হবে?”
শহীদ কন্যা সুফিয়া হায়দারের সহজ গদ্যে লেখা এই বইয়ের শেষ কয়েক লাইনে অশ্রুরোধ অসম্ভব।
“প্রিয় বাবা, এখন কি আপনি ভালো আছেন? স্থিতু হতে পেরেছেন মা’কে নিয়ে? আপনার বড় ছেলে কাজল আর মেয়ে শিখুও তো গিয়েছে আপনাদের কাছে ; আমরাও আসব একদিন . . .সঅন্য ভুবনে আপনাকে নিয়ে আবার কি সুখী হতে পারব সবাই?”
বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখিকা সুফিয়া হায়দার সম্পর্কে কিছু তথ্য পাই। ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর তার জন্ম। হুমায়ূন সাহিত্য অনুরাগী পাঠকরা যাকে “শেফু” নামে চিনে থাকেন তিনি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন শেষে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। বহু বছর পড়িয়েছেন মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজে। ৩০ বছরের শিক্ষক জীবন শেষে তিনি সরকারী কবি নজরুল কলেজ থেকে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে অবসর নেন। “আমার দুঃখী বাবা” তার লেখা প্রথম বই। বাবার জন্মশতবর্ষে লেখা এ প্রকাশনা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। কিন্তু এতে অনবদ্য সুনির্দিষ্টতায় উল্লেখিত একাত্তরের মহান জনযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লড়াই। বাঙালিকে যার কাছে ফিরতে হয় বারবার। একই সঙ্গে এই বই প্রামাণ্য একটি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা পরিবারের। বাংলাভাষী মানুষের তুমুল কৌতূহল জাগানিয়া হুমায়ূন আহমেদ পরিবারের যাবতীয় বিবরণ এই “আমার দুঃখী বাবা”।
সহজবোধ্য ভাষার সাথে শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদকে নিয়ে লেখা এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে ঐতিহাসিক কিছু ছবি। অধ্যাপক সুফিয়া হায়দারের লেখনীতে ৯৬ পৃষ্ঠায় পাঠক একটি পরিবারের গল্প পাবেন ; যা তীব্রভাবে যুক্ত বাংলার মুক্তিসংগ্রামে রক্তিম ইতিহাসের ক্ষণসহ বর্ণনায়। আহসান হাবীবের অনন্য প্রচ্ছদে তাম্রলিপি প্রকাশিত মলাট বন্দি এই বই একটি পরিবারের সুখ স্মৃতি, অনিশ্চয়তা আর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের অলীক বয়ান। গায়ে লেখা দাম ২০০ টাকা হলেও 'আমার দু:খী বাবা' আদতে এক অমূল্য প্রকাশনা। যে বইয়ের পরতে পরতে মুক্তি সংগ্রামে শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এর মন জুড়ানো স্মরণ। প্রিয় মৃতরা ঘুমায় না, বরং জেগে থাকে সে ইঙ্গিত জন্মশতবর্ষে মানুষনিষ্ঠ ফয়জুর রহমান আহমেদের এই জীবনী বর্ণনা।
লেখার শুরুতে হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গ ছিল। অন্তিমে চাই যেন তা থাকে।
২০১২ সালের ৪ অগাস্ট প্রকাশিত “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম” এ দেখি একটি প্রাসঙ্গিক বার্তা।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ফয়জুর রহমানের কবরের মাটি ছেলে হুমায়ূন আহমেদের সমাধিতে মিশিয়ে দিলেন আয়েশা ফয়েজ। ২৪ জুলাই ছেলেকে সমাধিস্থ করার পর এই প্রথম কবর জিয়ারতে গেলেন তিনি।
আয়েশা ফয়েজের সঙ্গে ছিলেন তার বোন রিজিয়া খানম, মেয়ে সুফিয়া হায়দার, মেয়ে রোকসানা আহমেদ, ছেলে আহসান হাবীব প্রমুখ।
নুহাশ পল্লীর ভাস্কর মো. আসাদুজ্জামান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, আয়েশা ফয়েজ ছেলের কবরের মাটিতে বার বার হাত বুলাচ্ছিলেন। প্রয়াত সন্তানের কল্যাণ কামনায় আল্লাহর কাছে আকুতিও জানাচ্ছিলেন তিনি।
“তিনি বলতে থাকেন, আল্লাহ, হুমায়ূনকে দুনিয়াতে যেমন সম্মান দিয়েছ, আখেরাতেও সে ধরনের সম্মান দিও। তিনি কিছু সময় কবরের কুরআন তিলওয়াতও করেন,” বলেন আসাদুজ্জামান।
আয়েশা ফয়েজ যখন কুরআন তিলওয়াত করছিলেন, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা কবরের ওপর মাটি ছড়াতে থাকেন বলেও জানান তিনি।
কবরের মাটির এই মেলামেশা আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ। তবে এ থেকে শিক্ষা পাই, এ পরিবার বাংলাদেশের মাঙ্গলিক যত কীর্তি তার সাথে সম্পর্কীত। ফয়জুর রহমান আহমেদ যেমন অতন্দ্র শহীদ হয়ে জেগে আছেন, তার সন্তানরাও আমৃত্যু এই মাটির প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন এর নিশ্চয়তা।
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন এর জন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।



