Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রয়াণ দিবসে কবি আল মাহমুদ স্মরণ

‘... অনেকেই সমালোচনা করেন যে, আল মাহমুদ ১৯৯০’র দশকে ইসলামী ধর্মীয় বোধের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার কবিতায় ইসলামী চেতনার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। যদিও তিনি বিভিন্ন সময় তা অস্বীকার করেছেন।...’

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৫০ পিএম

যিনি কবি আল মাহমুদ তাকে প্রথম চিনি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। তার ‘‘খড়ের গম্বুজ’’ কবিতা আমাদের এসএসসি সিলেবাসে ছিল। সেখানে একটা লাইন ছিল এমন, “ . . . তোমাকে বসতে হবে এখানেই, এই ঠান্ডা ধানের বাতাসে।”

যে কবির লেখা পড়ে গায়ে কাঁটা দেয় তাকে আরও পড়া-জানা হয় পরে। স্কুল শেষে “এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে” বয়সে একই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে যাই। সেটি ২০০০ সাল পরবর্তী সময়। তখন পাঠচক্রের জন্য আল মাহমুদের ‌‌‌‘‌‌‌‘একুশের কবিতা’’, ‘‘ঊনসত্তরের ছড়া’’ পড়ি। অনেক মানুষকে উজ্জীবিত করেন এমন স্রষ্টা মনে হয় এই কবিকে। কিন্তু তাকে নিয়ে বাজে বাজে কথা কানে আসে। যেমন- উনি ‘‘জামায়াত’’ করেন, ‘‘মৌলবাদী’’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সে বয়সে তো যাচাইয়ের সুযোগ নেই। ভীষণ ধাঁধা হয়ে থাকেন আল মাহমুদ।

সব রহস্যের অবসান ঘটান অপার করুণাময় স্রষ্টা। বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি আল মাহমুদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সুযোগ হয় ২০০৬ সালে। তারিখ মনে নেই। আমি তখন দৈনিক সমকালের সাপ্তাহিক রাজনৈতিক সাময়িকী ‘‘জনমঞ্চ’’-এর কন্ট্রিবিউটর। অ্যাসাইনমেন্টের আশায় সারাদিন পড়ে থাকি দৈনিকটির ফিচার বিভাগে। ‘‘জনমঞ্চ’’ সম্পাদক ছিলেন এসএ মামুন ভাই। ফিচার এডিটর প্রয়াত সাংবাদিক গোলাম ফারুক ভাই অনেক নির্দেশনা দিতেন কন্টেন্ট বিষয়ে। রাজনৈতিক বিষয় হওয়ায় দৈনিকের সিনিয়র কর্তা মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু ভাই, প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান ভাইয়েরাও ‘‘জনমঞ্চ’’-এর দিকে চোখ রাখতেন।

তখন ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান দিবসের তারিখ আসন্ন। কন্টেন্ট মিটিং চলছে। আমি প্রস্তাব দেই আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘‘ঊনসত্তরের ছড়া’’ (. . .ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিউরকে ডাক . . .)  নিয়ে তার ভাষ্য অনুলিখনের। পত্রিকার কন্টেন্ট ছলনা মাত্র। আমার বাসনা কবিকে স্বীয় চোখে দেখা। তাকে নিয়ে নিজের ধাঁধা কাটানো। কবি আল মাহমুদের বাসার টিএন্ডটি ফোন নম্বর দেন সাহিত্য সাময়িকী ‘‘কালের খেয়া’’র তৎকালীন সম্পাদক (এখনের একাত্তর টিভির ঊর্ধ্বতন কর্তা) শহীদুল ইসলাম রিপন ভাই। তীব্র উত্তেজনায় ফোন দেই। কিন্তু কবি ফোন রিসিভ করেন না। ফোন তোলেন তার পুত্র। তিনি বাসার ঠিকানা দেন। দু’দিন পর এক বিকেলে চলে যাই গুলশান-২ এ কবির ফ্ল্যাটে। জনশ্রুতি ছিল জামায়াতের লোকরা এই ফ্ল্যাট তাকে দিয়েছে। ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই দেখলাম আল মাহমুদ লুঙ্গি ফতুয়া পরে বসে আছেন। তাকে ঘিরে অনুরাগীর দল। সালাম দিয়ে, পরিচয় দিয়ে তার কাছে আসার উদ্দেশ্য জানাই। প্রেসের লোক দেখে তার অনুরাগী দল একটু সরে যায়। আমি একান্তে মাহমুদ ভাইয়ের কাছে রেকর্ডার নিয়ে বসি। উনি প্রায় ২০ মিনিট ‘‘ঊনসত্তরের ছড়া’’ নিয়ে কথা বলেন। কথা বলতে বলতে মাহমুদ ভাই একটার পর একটা গোল্ডলিফ সিগারেট ধরাচ্ছিলেন। সোফার পেছনে একটি রূপালী রঙের বড় অ্যাশট্রে ছিল। সেটা বারবার সামনে এনে ছাই ফেলছিলেন। কিন্তু সামনের টেবিলে রাখছিলেন না অ্যাশট্রে।

ছাই ফেলা শেষ হলে আবার পেছনে রাখেন। এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, ‘‘তুমিও তো মনে হচ্ছে সিগারেট খাও। ধরাও, ধরাও। বাসায় থেকে খেতে দেয় না। তোমরা আসলে খেতে পারি।’’ আমি কবি আল মাহমুদের সামনে সিগারেট জ্বালাবার অনুমতি পাই। আমার সাহস বেড়ে যায়। ‘‘ঊনসত্তরের ছড়া’’ বিষয়ক কাজ শেষ হলে রেকর্ডার বন্ধ করি। বুঝি এই আমার সুযোগ। যা ধাঁধা এখনই দূর করতে হবে। তার বাঁক বদল সম্পর্কে প্রশ্ন করি। বাংলা উইকিপিডিয়ার যেটি লিখিত এভাবে -

‘‘... অনেকেই সমালোচনা করেন যে, আল মাহমুদ ১৯৯০’র দশকে ইসলামী ধর্মীয় বোধের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার কবিতায় ইসলামী চেতনার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। যদিও তিনি বিভিন্ন সময় তা অস্বীকার করেছেন।...’’

তখন আল মাহমুদ খুব বিরক্ত হন। বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করলাম। এখন দাড়ি রেখে রাজাকার হয়ে গেলাম? তোমাদের মুক্তিযুদ্ধওয়ালারা তো আমাকে চাকরি দেয়নি। আর আমার অপরাধ কী? আমি তো সারাজীবন কবিতাই লিখে গেছি। এরপর প্রশ্ন করি তার বিশ্বাস নিয়ে। তখন তিনি আরও ক্ষেপে যান। বলেন, ‘‘শোনো যুবক, আমার বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতে এসো না। আমি সারাজীবনই বিশ্বাসী ছিলাম। হজের সময় কাবার দিকে তাকিয়ে আমি থরথর করে কেপে উঠেছিলাম।’’

আমি কোনো বড় সাহিত্যিকের কাছে গেলে কিছু ব্যক্তিগত বৃন্তান্ত জানতে চাই। যেমন - কখন লিখতে বসেন? কী পড়েন লেখার আগে? ভোরে লিখতে বসেন না কী গভীর রাতে? ইত্যাদি ইত্যাদি। মাহমুদ ভাইকেও এগুলো জিজ্ঞেস করলাম। উনি হাসলেন। আমার কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ঠিক নেই। কবিতা যেন কীভাবে এসে যায়!

এই এসে যাওয়ার রাস্তাই আজ পর্যন্ত জানা হলো না! মাহমুদ ভাই ওনার বইয়ের সংগ্রহ দেখালেন। লেখার টেবিল দেখালেন। তিনি তখন এক চোখে প্রায় দেখেনই না। সেটা নিয়ে আবার ‘‘কানা মামুদ’’ সিরিজের কবিতা লিখেছেন। টেবিলে দেখলাম বিশেষ ধরনের লাইট সেটআপ। তারপর বিদায় চাই। উনি অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বলছিলেন, লিখে দিও তোমার যা ভালো লাগে। বেশির ভাগ বড় মানুষদের দেখেছি অনুলিখন, সাক্ষাৎকারের বিষয়ে খুব সাবধান। বারবার বলেন, ‘‘ছাপার আগে দেখাইয়্যা নিও।’’ আল মাহমুদ এর আলাদা ছিলেন।

এরপর দীর্ঘ যোগাযোগহীনতা আল মাহমুদের সাথে। সম্ভবত ২০১৬ সালে ইত্তেফাকের একটি বিশেষ সংখ্যায় চুক্তিভিত্তিকভাবে কাজ করি সাহিত্য সম্পাদক কবি ফারুক আহমেদ ভাইয়ের অধীনে। তখন বিজয় দিবসের আগে আবার তার বাসায় যাই কবিতা আনতে। তিনি তখন মগবাজার থাকেন। মাহমুদ ভাই যখন মগবাজারের ফ্ল্যাটে যান তখন বন্ধুরা মজা করে বলতাম, পার্টি অফিসের কাছের এলাকায় ফিরে গেছেন! জামায়াতের অফিস যে মগবাজারে সেটা তো সবাই জানেন।  

মাহমুদ ভাইকে দেখলাম তিনি নিজে হাতে লিখতে পারেন না। মুখে বলতেন আর লিখে নিতে হতো। বারবার বলছিলেন, পড়ো। এখানে দাঁড়ি দাও, এখানে সেমিকোলন দাও। এভাবে পুরো কবিতাটা দাঁড় করাতেন। কতখানি স্মৃতিশক্তি এই মানুষের ভেবে অবাক লাগল। আমাকে দেয়া কবিতার শুরুটা ছিল এমন, ‘‘শেষ হয়নি কী আমাদের দেওয়া নেওয়া? হাত তুলে দাড়িয়ে আছে পাড়ানি মেয়েটি বিদায়ের শেষ খেয়া...’’

আরেকবার ফারুক ভাই আর আমি কবির জন্য ক্যাডবেরি চকলেট নিয়ে যাই। খুব খুশি হয়ে ফোঁকলা দাতে হেসেছিলেন আল মাহমুদ। বললেন, কে খাবে?

আরেকবার ফারুক ভাই কবির বাসায় নিয়ে গিয়ে গেলেন। আড্ডার মধ্যে বললেন, মাহমুদ ভাই, আপনার ‘‘জলবেশ্যা’’ নিয়ে সিনেমা বানাব।

আল মাহমুদ হেসে বললেন, ‘‘তো বানাও। আমি তো সিনেমারই লোক। অনেক গল্প আছে আমার।’’ আমরাও হেসে উঠলাম।

বাংলা কবিতার কিংবদন্তি আল মাহমুদকে নিয়ে এমন টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি আমাদের। আজ তার প্রয়াণ দিবস। মস্তিস্ক হয়তো তাই উগড়ে দিচ্ছে এর অনেকটা।  
কবিদের তো মৃত্যু নেই। কবি মানে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। যখন দরকার হবে তখনই তার সৃষ্টির কাছে ফেরত আসা যায়। বঙ্গবন্ধুর আমলে গণকণ্ঠের সম্পাদক হয়ে জেল খাটেন কবি আল মাহমুদ। আবার ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন।

সমসময়ে খুব মনে অনিবার্য লাগে আল মাহমুদের জেল ‘‘গেটে দেখা’’ কবিতাটি।

‘‘সেলের তালা খোলা মাত্রই এক টুকরো রোদ এসে পড়লো ঘরের মধ্যে
 আজ তুমি আসবে।
সারা ঘরে আনন্দের শিহরণ খেলছে। যদিও উত্তরের বাতাস
হাঁড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে বইছে, তবু আমি ঠান্ডা পানিতে
হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পাহারাদার সেন্ট্রিকে ডেকে বললাম,
আজ তুমি আসবে। সেন্ট্রি হাসতে হাসতে আমার সিগ্রেটে
আগুন ধরিয়ে দিল। বলল , বারান্দায় হেঁটে ভুক বাড়িয়ে নিন
দেখবেন, বাড়ী থেকে মজাদার খাবার আসবে।
দেখো, সবাই প্রথমে খাবারের কথা ভাবে।
আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে। ক্ষুধার্ত মানুষ হন্যে হয়ে
শহরের দিকে ছুটে আসছে। সংবাদপত্রগুলোও
না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয়।
রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে
আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি
চেপে ধরেছি ।

হায় স্বাধীনতা, অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা
সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম।

আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি
যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায়। যাতে
আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই ।

কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি? আমি পাষাণ কারার
চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি।
শত দুর্দৈবের মধ্যেও আমরা যেমন আমাদের উৎসকে
জাগিয়ে রাখতাম, তেমনি
চড়ুই পাখির চিৎকারে বন্দীদের ঘুম ভাঙছে ।

আমি বারান্দা ছেড়ে বাগানে নামলাম।
এক চিলতে বাগান
ভেজা পাতার পানিতে আমার চটি আর পাজামা ভিজিয়ে
চন্দ্রমল্লিকার ঝোপ থেকে একগোছা শাদা আর হলুদ ফুল তুললাম ।
বাতাসে মাথা নাড়িয়ে লাল ডালিয়া গাছ আমাকে ডাকলো ।
তারপর গেলাম গোলাপের কাছে।
জেলখানার গোলাপ, তবু কি সুন্দর গন্ধ!

আমার সহবন্দীরা কেউ ফুল ছিঁড়ে না, ছিঁড়তেও দেয় না
কিন্তু আমি তোমার জন্য তোড়া বাঁধলাম ।

আজ আর সময় কাটতে চায় না। দাড়ি কাটলাম। বই নিয়ে
নাড়াচাড়া করলাম। ওদিকে দেয়ালের ওপাশে শহর জেগে উঠছে ।
গাড়ীর ভেঁপু রিক্সার ঘন্টাধ্বনি কানে আসছে।
চকের হোটেলগুলোতে নিশ্চয়ই এখন মাংসের কড়াই ফুটছে ।
আর মজাদার ঝোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে
গরীব খদ্দেরদের পাতে পাতে।
না, বাইরে এখন আকাল। মানুষ কি খেতে পায়?
দিনমজুরদের পাত কি এখন আর নেহারির ঝোলে ভরে ওঠে?
অথচ একটা অতিকায় দেয়াল কত ব্যবধানই না আনতে পারে ।

আ, পাখিরা কত স্বাধীন । কেমন অবলীলায় দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছে
জীবনে এই প্রথম আমি চড়ুই পাখির সৌভাগ্যে কাতর হলাম।
আমাদের শহর নিশ্চয়ই এখন ভিখিরিতে ভরে গেছে।
সারাদিন ভিক্ষুকের স্রোত সামাল দিতে হয় ।
আমি কতবার তোমাকে বলেছি, দেখো
মুষ্টি ভিক্ষায় দারিদ্র্য দূর হয় না ।
এর অন্য ব্যবস্হা দরকার, দরকার সামাজিক ন্যায়ের ।
দুঃখের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে ।
আ, যদি আমার কথা বুঝতে!

প্রিয়তমা আমার ,
তোমার পবিত্র নাম নিয়ে আজ সূর্য উদিত হয়েছে। আর
উষ্ণ অধীর রশ্মির ফলা গারদের শিকের ওপর পিছলে যাচ্ছে ।
দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘুমভাঙ্গা মানুষের কোলাহল!
যারা অধিক রাতে ঘুমোয় আর জাগে সকলের আগে ।
যারা ঠেলে।
চালায়।
হানে।
ঘোরায় ।
ওড়ায় ।
পোড়ায় ।
আর হাত মুঠো করে এগিয়ে যায় ।
সভ্যতার তলদেশে যাদের ঘামের অমোঘ নদী ।
কোনদিন শুকোয় না। শোনো, তাদের কলরব।

বন্দীরা জেগে উঠছে। পাশের সেলে কাশির শব্দ।
আমি ঘরে ঘরে তোমার নাম ঘোষণা করলাম
বললাম, আজ বারোটায় আমার ‘দেখা’।
খুশীতে সকলেই বিছানায় উঠে বসলো।
সকলেরই আশা তুমি কোন না কোন সংবাদ নিয়ে আসবে।
যেন তুমি সংবাদপত্র! যেন তুমি
আজ সকালের কাগজের প্রধান শিরোনামশিরা !

সূর্য যখন অদৃশ্য রশ্মিমালায় আমাকে দোলাতে দোলাতে
মাঝ আকাশে টেনে আনলো
ঠিক তখুনি তুমি এলে ।
জেলগেটে পৌঁছে দেখলাম, তুমি টিফিন কেরিয়ার সামনে নিয়ে
চুপচাপ বসে আছো।
হাসলে, ম্লান, সচ্ছল।
কোনো কুশল প্রশ্ন হলো না।
সাক্ষাৎকারের চেয়ারে বসা মাত্রই তুমি খাবার দিতে শুরু করলে।
মাছের কিমার একটা বল গড়িয়ে দিয়ে জানালে,
আবার ধরপাকড় শুরু হয়েছে।
আমি মাথা নাড়লাম।
মাগুর মাছের ঝোল ছড়িয়ে দিতে দিতে কানের কাছে মুখ আনলে,
অমুক বিপ্লবী আর নেই
আমি মাথা নামালাম। বললে, ভেবোনা,
আমরা সইতে পারবো। আল্লাহ, আমাদের শক্তি দিন ।
তারপর আমরা পরস্পরকে দেখতে লাগলাম।
যতক্ষণ না পাহারাদারদের বুটের শব্দ এসে আমাদের
মাঝখানে থামলো।"

আল মাহমুদকে মনে হয় লাগাতার এক কবি। যখন তখন যে কেউ তাকে পড়ে ফেলতে পারেন। যিনি বিপ্লবের ইশতেহার লিখতে পারেন সোনালী কাবিনে।

"আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ ।...’’

মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদের ‘‘আল মাহমুদ’’ হয়ে উঠতে হয় অজস্র যুদ্ধের পর। নেই তার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি। মফস্বলের লোক তিনি। পত্রিকায় কাজ শুরু করেছেন প্রুফ রিডার হিসেবে। অক্ষরের শক্তি ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না যার। সে একমাত্র জাদুতেই তিনি আল মাহমুদ। বাংলা সাহিত্যের এক নিখাঁদ নক্ষত্র। সর্বজনের কবি তিনি। জামায়াত তার মতো ভাঙানোর চেষ্টা করে তাকে। প্রগতিশীলরাও মানতে বাধ্য তার কাব্যশক্তি।

মাহমুদ ভাইয়ের মৃত্যুও হয়েছে তার লেখা কবিতার ইচ্ছেমাফিক। ২০১৯ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি দিনটি শুক্রবার ছিল।

‘‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।

ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন—
নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি কিংবা কিছু নয়;
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন
কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী নিশ্চয়।

স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?
কেন দোলে হৃদপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!

আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার’’

এক জীবন পাড়ি দেওয়া সম্ভব শুধু আল মাহমুদের সৃষ্টি পড়েই। সংখ্যায় তা এতই বিপুল। আমরা অনেকেই তা শেষ করতে পারিনি। আমরা করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞ যে, আমরা আল মাহমুদের সময়ে ছিলাম। আমরা নক্ষত্রকে ছুঁয়েছি। ব্যস! আর কি কিছু লাগে?


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



About

Popular Links