বেঁচে থাকলে আজ ৮৩-তে পা ফেলতেন। কিন্তু গত পহেলা অগ্রহায়ণেই আপনার চলে যাওয়া। আমাদের গরমের দেশে যখন শীত এলো, তখন আপনি চির ঘুমের দেশে। বোধকরি, আপনার রাজশাহীতে হিম নেমেছে আরো আগে। আমাদের কংক্রিটের শহরও তা টের পায় দেরিতে।
‘‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’’ - এ প্রকৃতির এমন বিবরণ দিয়েছেন আপনি এভাবে- “এখন নির্দয় শীতকাল, ঠাণ্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়।...”
গত ১৫ নভেম্বর বাসায় ফিরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বেদনা বার্তা পাই। আপনি নেই। চলে গেলেন হেমন্তের পুরোটা না দেখে। শস্য ফলালো যারা, তারা পাবে ফসলের সামান্য ভাগ। বিরাজমান এই বাস্তবতায় আর গর্জে উঠবে না আপনার কলম। চাটুকার বুদ্ধিজীবিতার দেশে আমাদের আরো নিঃসঙ্গতর করলেন স্যার আপনি।
ব্যক্তি আপনার সঙ্গে টেলিফোনে প্রথম পরিচয় ২০০৯ সালের দিকে। মাথায় সিনেমা পোকা তীব্র তখন। “মন তার সর্পনী” নিয়ে চিত্রনাট্য করেছিলাম তখনের বন্ধুদের নিয়ে। ফোন নম্বর জেনে আপনাকে ফোন দেই। ভীষণভাবে সাড়া দেন আপনি। কিন্তু এ নিয়ে ছবি না হওয়ার দায় নিজেদের। মূলত আমাদের অপেশাদারিত্বের কারণেই কাজটি হয় না। দিনাজপুর পর্যন্ত যাই। কিন্তু লজ্জায় আপনার রাজশাহীমুখী হই না। কীভাবে মুখ দেখাবো স্যার আপনাকে? ফলাফল দীর্ঘ যোগাযোগহীনতা।
২০১৫ সালের নভেম্বরে ইত্তেফাকের একটি বিশেষ সংখ্যার জন্য চুক্তিভিত্তিক কিছু কাজে সম্পৃক্ত হই তৎকালীন দৈনিকটির সাহিত্য সম্পাদক কবি ফারুক আহমেদ ভাইয়ের সঙ্গে। ফারুক ভাই কনটেন্ট প্ল্যান তৈরি করেন। কাজ ভাগ করে দেন টিমের মধ্যে। আমার বরাতে থাকা অন্য অনেকগুলো কাজের মধ্যে পড়ে আপনার একটি অনুলিখন। সাম্প্রতিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আপনার কলাম হিসেবে যা প্রকাশ হয়। ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যার দিকে ইত্তেফাক অফিস থেকে আপনার ল্যান্ডফোন নম্বরে ফোন দেই। নিজের পরিচয় দেই। আপনি চিনতে পারেন। দুঃখ প্রকাশ করি। ক্ষমা চাই প্রায় ১০ বছর আগের অসমাপ্ত কাজের জন্য। আপনি ক্ষমা তো করেনই, সঙ্গে সাহস জোগান। বলেন, “বাদ দাও। কাজ হয়নি, হবে আগামীতে। এখন কেন ফোন করেছ বলো? কী করছ?”
প্রসঙ্গ বলি, প্রায় ২০ মিনিটের মতো আপনার সঙ্গে কথা হয়। সেটা অনুলিখন করি।
এখন আর্কাইভে থাকা মেইল থেকে সে অনুলিখনের কিছুটা পাঠকদের জন্য তুলে দিতে চাই। সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, বহু হবে। তবে শিক্ষাবিদ হিসেবে স্যারের প্রখরতা টের পাওয়া এ সময় ও ভবিষ্যতের দেশকর্তা ও শিক্ষাখাত নিয়ে কর্মরত, ভাবনারতদের জানা খুব জরুরি।
“ . . .শিক্ষা বলতে আমি মনে করি একটি বিশাল ব্যাপার। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা পুরোটা মিলিয়েই শিক্ষা। প্রাথমিকে আমাদের কত শিশু ভর্তি হয়? এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলো কতটুকু নির্ভরযোগ্য তা আমার জানা নেই। আগে শুনতাম আমাদের ২০ শতাংশ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হয়। বাকি ৮০% শিক্ষার বাইরে থেকে যেত। এখন শুনছি ৮০% শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। বাকি ২০% শিশু স্কুলে যায় না। কিন্তু এই ৮০%-এর কতজন মাধ্যমিক স্তরে যায় তা আমার জানা নেই। এদের কত শতাংশ কলেজে ভর্তি হয়, কত শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষার সনদ নিয়ে বেরিয়ে যায় এ সংক্রান্ত তথ্য আমার অজানা।
এখন সারাদেশেই অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। অনুমান করতে পারি, সব মিলিয়ে হয়তো ৭০-৮০ হাজার থেকে এক লাখ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে আসে। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যাটি কী বার্তা দেয়? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত পারে এই কাঠামো দেখে।
জিপিএ ফাইভ নিয়ে অনেক উচ্ছ্বাস দেখি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নষ্ট করছে এই প্রক্রিয়া। পরে কিন্তু এই শিক্ষার্থীরা আমাদের মনোযোগে থাকে না। জিপিএ ফাইভপ্রাপ্তদের ছবিতে দেখতে পাই তারা সবাই “ভি চিহ্ন” প্রদর্শন করছে। এসব দেখে প্রশ্ন জাগে, এই বিজয় কিসের বিজয়? কোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই বিজয়?
এবার এ শিক্ষার মান নিয়ে বলি। প্রতিবার জিপিএ ফাইভের বিপুল স্রোত দেখছি। তবে কি দেশে মেধাবীদের সংখ্যা বেড়ে গেল? যারা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তারা কোথায় যাচ্ছে? শিক্ষিত ও অশিক্ষিত লোকের মধ্যে তো একটি তফাৎ থাকা উচিত। সেটি কি আমাদের সমাজে চোখে পড়ছে? আমাদের রাষ্ট্র কি শিক্ষার্থীদের পুরোপরি কাজে লাগাতে পারছে? সেটি যদি না হয়ে থাকে তাহলে এত শিক্ষিতের দায় কেন নিচ্ছে রাষ্ট্র? তাই আমার মনে হয় এই শিক্ষা ব্যবস্থার মাথা-মুণ্ডু কিছুই নেই।
বর্তমান দুনিয়া পুঁজির দুনিয়া। বিশ্ব পুঁজির একটি অংশ এই বাংলাদেশ। সেই পুঁজির স্বার্থে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য এনজিও। এই এনজিওরা এখন শিক্ষা দায়িত্বও নিয়ে বসেছে। একটি রাষ্ট্রের সরকার কতটা ব্যর্থ হলে এটি সম্ভব হয় , তা আমার জানা নেই। উচ্চশিক্ষা থেকে যারা বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ এসব এনজিওতে কাজ করছে। বড় একটি অংশ বেকার হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর মুষ্টিমেয় অংশ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আমাদের সৃষ্ট মেধা কাজ করছে বিদেশের উন্নয়নে। এই বিষয়টিও আমাকে কষ্ট দেয়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে এই পরিস্থিতিতে আমি কী করছি? আমি এর উত্তরে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই ‘ওরে ভীরু, তোর ওপরে নেই ভুবনের ভার’।
এখন কেউ মৌলিক বিষয়গুলো পড়তে চাচ্ছে না। অত্যন্ত অসম উন্নতি হচ্ছে আমাদের। গণতন্ত্র বলে সবাই চিৎকার করছে। গণতন্ত্র থাকলে শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা ছাড়া জাতি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। তাই যেহেতু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ তাই আমাদের গণতন্ত্রও ঠিক নেই। . . .”
লেখাটিতে পরে আরও কিছু সংযোজন করেন আপনি। প্রকাশিত হয় ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায়।
২০১৫ সালের নভেম্বরে ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজিত হয়। স্যার, আপনার কি মনে পড়ে এ আয়োজন শেষে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সুইমিং পুলের পাশে আপনাকে প্রথম চর্মচোখে দেখা। আমি আর ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক কবি ফারুক আহমেদ ভাই দু'জন আপনার সামনে। আপনি বারবার জানতে চাইছিলেন, “এখানে কফির দাম কত? ছোট এক বোতল পানির দাম কত?” ফারুক ভাই বারবার আসস্ত করছিলেন আপনাকে এই বলে যে, স্যার, আমি অর্ডার করছি। আপনি ভাববেন না। আমি টের পাই, আপনাকে পাঁচ তারা হোটেলে বন্দি সম্ভব নয়। আপনার নাভিমূল রাঢ় বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের জীবনধারায় বিন্যস্ত। প্রায় দুই ঘণ্টার মতো আপনার সাহচার্য পাই। জীবনের অমূল্য স্মৃতিতে তা সংরক্ষিত। একই জনপদে একই সময়ে অসামান্য হাসান আজিজুল হকের সহচার্য পেয়েছি। তাই আপনার চলে যাওয়ার প্রহরে নিজের এ জীবনকে খুব দামি লাগে।
২০১৬ সালে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে স্যার আপনি বলেছিলেন, “মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র ভাবাটা একটা ব্যাপার। তবে এ সব নিয়ে যে মানুষ ভাবে না, সে মানুষ না। মানুষ মাত্রই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।”
স্যার, আমরা তো নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি তুলে দিয়েছি চিহ্নিত প্রতারক চক্রের হাতে। নিজেদের “মানুষ” বলি কীভাবে? যে মানুষ তৈরির জন্য আমৃত্যু শিক্ষকতা করলেন তার ফল কী?
স্যার, আপনি এখন চিরঘুমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা আজও বিক্ষোভরত ‘উপাচার্য’ পদধারীদের বিরুদ্ধে। আমৃত্যু ছাত্রনিষ্ঠ আপনাকে ব্যাপকভাবে মিস করছে এই সময়। আমাদের বিক্ষোভ বিস্তারে ‘আগুনপাখি’র বড় প্রয়োজন। আপনি ছাড়া আর কার দ্বারা তা সম্ভব?
আপনার জন্মদিনের এ প্রহরে আনন্দ নয় বরং শোক আরো গাঢ় হয় এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেয়ে।
লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



