বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সন্তান জন্মদানের হার ও কারণ নিয়ে আলোচনা খুব একটা অযৌক্তিক কিছু নয়। অনাগত একটি প্রাণের আগমনকে আমরা কীভাবে দেখব? সে কি কেবলই দুজন মানুষের ভালোবাসার ফসল? পৃথিবীতে তার আগমন মানুষ হিসেবে বাস করার অধিকার নিয়ে নাকি সে শুধুই সংসারের মাঝখানে বোঝাপোড়ার সামগ্রী?
প্রশ্ন হতে পারে আরও- জীবন পরিক্রমায় প্রতিটি নরনারীর জন্য সন্তান উৎপাদন কি আবশ্যক? একাধিক সন্তান না থাকলে কি দাম্পত্যের তাৎপর্য কমে যায়? বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থই কি সন্তান জন্মদান এবং পরিপালন?
এসব বিষয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, আছে লম্বা তর্ক-বিতর্ক। তবে ঢালাওভাবে বলতে গেলে জিনগত প্রজননের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
পৃথিবীর অস্তিত্বই তো বিলীন হয়ে যেত যদি না মানুষ তার গুন, আচার, বংশ পরম্পরা, জ্ঞান, কর্মযজ্ঞ বহন না করে নিয়ে যেত পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টির মাধ্যমে। এই জন্ম আর সৃষ্টির ধারাবাহিকতার কল্যাণেই তো আমরা পেয়েছি অনেক ভালোবাসা, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, প্রতিটি জাতি,সমাজ, ধর্ম ও দেশে সন্তান প্রজননের কারণ মহিমান্বিত এবং যৌক্তিক।
তবে এই নিবন্ধে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিত্তশালী ও মধ্যবিত্ত সমাজের সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে।
যে দেশে মানুষ আর মানুষ গিজগিজ করছে, লাখ লাখ মানুষ বাস করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে, রয়েছে সম্পদের নজিরবিহীন অসম বণ্টন, হাজার হাজার মানুষ পেটের দায়ে চুরি, ছিনতাই আর ভিক্ষাবৃত্তি করছে, হাজারো শিক্ষিত বেকার ছেলে-মেয়ে মাথা চাপড়াচ্ছে, সেখানে একই পরিবারে দুইয়ের অধিক সন্তানের জন্মদান কতটা যৌক্তিক এসব নিয়ে গঠনমূলক চিন্তা ও পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
অধিক সন্তান জন্মদানের বিষয়টি যদি বর্তমান চীনদেশে হয়ে থাকত তবে বিষয়টিকে যৌক্তিক এবং সময়পোযোগী মনে করা যেত। কারণ অনেক বছর ধরে দেশটি “এক পরিবার এক সন্তান” নীতিতে হাঁটছে।
ফলে বর্তমানে চীনে সম্ভাবনাময় যুবগোষ্ঠী নেই বললেই চলে। দেশ ভরে গেছে ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক মানুষ দিয়ে। যারা অচিরেই দেশের বোঝায় পরিণত হতে পারে।
সে কারণে চীনা সরকার অন্যান্য দেশ থেকে দক্ষ তরুণদের নিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো চীনা পরিবার তিন বা চারটি সন্তান নেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলে দোষের কিছু নেই।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, কাঠামোগত এমন কোনো অবস্থা নেই যেখানে দুইয়ের অধিক সন্তান নেওয়া ব্যক্তি অধিকার হিসেবে গণ্য হবে। তার মানে আবার এই না যে, যারা ইতোমধ্যে তিন-চারটি সন্তান নিয়েছেন, তারা অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছেন।
আসলে এখন ভাববার সময় এসেছে, বিচার-বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। সন্তান জন্মদান এবং তাদের গড়ে তোলার মতো আনন্দের বিষয় খুব কমই আছে। কিন্তু সব কিছুই একটা সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে দেশ ও সমাজের অবস্থা বিবেচনায় আনতে হবে। দেশের দারিদ্র্য আর জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে, সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক নিঃসন্তান দম্পতি বাবা-মা হওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত। আবার আমাদের সমাজেই অবহেলিত, এতিম, অনাহারে আছে অগণিত শিশু। তারা হয়ত পেতে পারে একটি শিক্ষিত, সুস্থ পরিবার ও পরিবেশ। এ কারণে দত্তক নেওয়াকে অবশ্যই উৎসাহিত করা উচিত। এতে নিঃসন্তান দম্পত্তি যেমন বেঁচে থাকার শক্তিকে পাবেন, একই সঙ্গে একটি অবহেলিত শিশু পাবে এতিমখানায় একাকীত্ব থেকে মুক্তি।
এভাবে সমাজের বিত্তশালী ও সক্ষম জনগোষ্ঠী অবহেলিত শিশুদের দায়িত্ব নিয়ে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে সরকারের আরও অনেক কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি চিকিৎসকদের মফস্বল ও গ্রামে জনসংযোগ বাড়াতে হবে।
দারিদ্র্য ঘোচানো কিংবা দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমানো মোটেও সহজ কথা নয়। দেশের সমাজ কাঠামোর কথা চিন্তা করলে অনেক কিছুর গোড়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। তাই অন্তত একদম দরিদ্রদের দুইয়ের অধিক সন্তান গ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর প্রসঙ্গে আসা যাক। এসব পরিবারে হতাশা এবং বৈবাহিক জটিলতার সমাধান হিসেবে গণ্য করা হয় বিয়ে করা ও সন্তান নেওয়াকে। যার পরিণতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয় না। বরং এতে দাম্পত্য কলহ বেড়ে যায়।
বিয়ের পর সন্তান নিলেই কি দাম্পত্য কলহ মিটে যায়? বাস্তবিক চিত্র কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। একটি অনাগত প্রাণ, এই পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র ধারণাই নেই তাকে পুঁজি করে দাম্পত্য কলহ মিটে যাবে- এমনটা আশা করা ঠিক না। সংসারে শান্তি আনতে জন্য যদি একটি সন্তানকেই নিয়ামক ধরা হয়, তবে সেই সন্তানকে ঘিরে সংসারে অশান্তি আসার সম্ভাবনাও ব্যাপক। বরং দম্পতিকে নিজেদের আনন্দ-অস্তিত্বের কথা ভাবতে হবে। নিজেদের পেশা, স্বপ্ন, শখ ইত্যাদির প্রতি যত্নশীল হতে হবে।
মেহনাজ পারভীন, লেখক
লেখক বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও অসমতা নিয়ে লেখেন, মানবতাকে সর্বাগ্রে গণ্য করেন। তিনি চার বছর শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।
প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন এর জন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।