নিজেকে শনাক্ত করতে গোলকধাঁধাঁ। শিল্পীদের যেন সমস্যা বেশি। তখন কবীর সুমন সহজতম নিজেকে ব্যাখ্যায়।
“ . . . মজুরীতে ভাগ বসাচ্ছে যারা তোমার কলকাতাতে
তাদেরই গাইয়ে আমি সাজানো জলসায়।
গেঁয়ো সুর ভেসে বেড়ায় শহুরে হাওয়া।”- বাশুরিয়া
১৯৯২ সাল থেকে এই “তোমাকে চাই” স্রষ্টার সকাশে মধ্যবিত্তের বাঙলা গান। আজ ৭৩ বছরে পা রাখলেন তিনি।
শুভ জন্মদিন, কবীর সুমন!
এই মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আলোচিত অথবা সমালোচিত। কিন্তু অনালোচিত নন। তার সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকেন না এমন কেউ নেই। হোক তিনি লাভারর্স বা হেটারর্স। সুমনের ক্যারিশমা কি এখানেই?
নিকারাগুয়া বিপ্লবের এই দিনলিপিকার বহুভাবে কিংবদন্তি হতে পারতেন। তার কাব্য, অনুবাদকর্ম, ধারাবর্ণনা ও বিশ্বখ্যাত সাংবাদিকতা গুণেই তা সম্ভব ছিল। কিন্তু সঙ্গীতকে পাঁজরের গভীরতম জায়গায় রেখে তার কলকাতায় ফেরা। এখনও সেই কলকাতায় আছেন। আষ্টেপিষ্টে আছেন বাঙলা সঙ্গীতে। সর্বশেষ সৃষ্টি বাঙলা খেয়াল নিয়ে নিরীক্ষায় সারাবেলা।
শুধুমাত্র একটা গিটার নিয়ে বুক চিতিয়ে বাঙলা গান গাওয়া সম্ভব তা প্রমাণ করে সুমন পথ প্রদর্শক বহু প্রজন্মের। বাঙলা গান মানে চলতে থাকা যুগ যুগের “আমি” “তুমি” আর না। সমস্বরে গাওয়া গীতেই তার সঙ্গীত হয়েছে সর্বজনের। অনাবিস্কৃত এমন লিরিক শুনে মিডিয়া সমানে বসিয়েছে “জীবনমুখী” গান তকমা। কিন্তু “মরব দেখে বিশ্বজুড়ে যৌথ খামার” এর অপেক্ষায় থাকা সুমন কখনোই বিশ্বাস করেন না “জীবনমুখী” গান বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব।
পিট সিগারের সঙ্গে গান গাওয়া বিশ্ব নাগরিক এক কবীর সুমন ধরায় না এলে আমরা জীবন নিয়ন্ত্রণকারী রাজনীতি বুঝতাম না। আর তা কোনো গুরুপাচ্য মাধ্যমে নয়। সবার বোঝা গানের ভাষায় চিন্তার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন এই মায়েস্ত্রো। বাচ্চাদের কেন বসে আঁকতে হয়? তিতুমীরের নাম কেন ব্যারিকেডে নেই? বিচার হলে কেন হয় না গান শুনানী? ভোটের সকালে লজ্জিত কেন শুধু ক্রিকেট ব্যাট? বেহুলা কেন বাঙলার রীতি মেনে কখনও বিধবা হয়না? - এমন বহু বহু প্রশ্ন ছুড়ে নিজেই এর উত্তর দেয়া এই সৃষ্টিশীল সুমন।
বিক্ষোভে, বিপ্লবে তাকে চাই। তখন তিনি গ্রেনেড হয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখেন। আবার “মৌন মুখরতা”য় তিনি কোনো কথায় বাঁধা নেই। বাঙলা আধুনিক গানে দশভূজা চরিত্র কি এই কবীর?
আবার মনেহয় শুধু গানই তো তার ক্ষেত্র নয়। কোন প্রহরে বাঙালির মনোজগত তাকে বাদ দিয়ে ছিল? ব্যক্তি সুমন কি কম প্রভাবক?
রাজনীতি করে সাংসদ হয়েছেন। কিন্তু এও যেন সেই “যদি ভাবো কিনছো আমায় ভুল ভেবেছো”র ম্যাজিক। হতে পারেননি এবং হতে পারবেনও না মমতা ব্যানার্জির পোষ্য কেউ। তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণে না মোল্লা খুশী, না পুরোহিতের মুখ ভার। কবীরের ধর্ম মানুষ ভজন। সুমন তাই করে যাচ্ছেন।
একই সঙ্গে জননন্দিত ও বহু লোকও ক্ষ্যাপা সুমনের ওপর। কবীর সুমন কবে বুড়ো হবেন? কবে তাঁর ভীমরতি ধরবে? এ দেখার অপেক্ষায় বহুজন। আজ ৭৩ ছোঁয়ার পর থেকে এদের নজর থাকবে ৭৪ এর দিকে। কিন্তু আমরা তো কবীরপন্থি। আমরা করবোটা কী?
আমরা অপলক বিস্ময় ভরে দেখব আর শুনব তাকে। আমৃত্যু এতটুকু ক্লান্ত হব না এই “নদীর স্রোতে কূলের জড়তা” ভাঙা কিংবদন্তির জন্য। এই পৃথিবীর ঘাতকেরা গান না শুনলেও সুমনের কিছু আসবে যাবেনা। তিনি আসবেন এবং থাকবেন।
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালে ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত হয় হাসান শাওনের প্রথম বই ''হুমায়ূনকে নিয়ে''।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।