খুলনার ফুলতলা উপজেলার তিন কিলোমিটার উত্তরপশ্চিমে অবস্থিত দক্ষিণডিহি। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে এই দক্ষিণডিহির নাম নানাভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তার মা মৃণালিনী দেবী, কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী এবং স্ত্রী মৃণালিনী দেবী এই দক্ষিণডিহির বাসিন্দা ছিলেন।
১৯৯৫ সালে জেলা প্রশাসন দক্ষিণডিহির রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি দখলদারদের থেকে মুক্ত করে গড়ে তোলে “দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স”। ভারতের শান্তিনিকেতনের আদলে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
“দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স” নামটির সঙ্গে আমার জীবনেরও অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। এই কমপ্লেক্সটির উদ্বোধনের দিনে গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এছাড়া “দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স” প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে আমার বাবাও অন্যতম একজন ছিলেন।
নানা কারণে দক্ষিণডিহির সঙ্গে আমার সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলাম। এরপর ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এখানে গান গাওয়া হতো আমার।
যতদূর মনে পড়ে অনুষ্ঠানের আগে আমাদের মহড়া পরিচালনা করতেন সাধন ঘোষ স্যার। তিনি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠিত গানের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ফুলতলা আসাদ-রফি গ্রন্থাগারে আমাদের এই মহড়া বসতো। পরবর্তীতে কায়কোবাদ স্যারের বাড়িতে এই মহড়াগুলো করতাম আমরা।
সেইসব সুখের স্মৃতি মলিন হতে শুরু করে ২০০৬ বা ২০০৭ সালের পর থেকে। ক্রমে অনিয়মিত হয়ে পড়ি দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সের অনুষ্ঠানে। এর প্রধানতম কারণ পেশাগত ব্যস্ততা; ২০০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর এই দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। সেখানে গেলে বাবার অনুপস্থিতি প্রকটভাবে মনে পড়তো।
বাবার কথা যেহেতু এলো, একটু বলে নিই। রবীন্দ্র কমপ্লেক্স উদ্বোধনের অনেক আগে থেকেই বাবা ও বন্ধু অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরালয় নিয়ে নানা ধরনের লেখালেখি করতেন। সেগুলো পত্রপত্রিকায় প্রকাশও পেতো। এরপর জেলা প্রশাসন যখন বাড়িটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয় তখন বাবা ও তার বন্ধুরাও মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।
আমার বাবা দেব রঞ্জন সেন ছিলেন পায়গ্রাম কস্বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক। তিনিই “দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স” নামটি দিয়েছিলেন। শুরু থেকে প্রথম কয়েক বছর তিনি এই প্রকল্পের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাবা ছাড়াও এই দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলার বিষয়ে যারা অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক রাজা, কাজী খেলাফত হোসেন বাচ্চু, বিধান দাশগুপ্ত, অচিন্ত্য কুমার ভৌমিক, শেখ লুৎফর রহমান, বরুন মিত্র, অধ্যাপক কায়কোবাদ, অধ্যাপক মুক্তি মজুমদার, অধ্যাপক সাধন রঞ্জন ঘোষ, অধ্যাপক শফিউল্লাহ সরদার, মিনা মিজানুর রহমান, নওরোজ হোসেন, খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক, ফুলতলা উপজেলার তৎকালীর ইউএনও শামীমা সুলতানা প্রমুখ রয়েছেন।
১৯৯৫ সালে বাড়িটি দখলমুক্ত করে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পর এখানে বহু গুণী শিল্পী এসেছেন। রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ড. সানজিদা খাতুন, সঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, পাপিয়া সারওয়ার, সাদী মুহাম্মদ, মিতা হক, শিবলী মাহ্মুদ, শামীমারা নীপাসহ অনেক প্রখ্যাত শিল্পী দক্ষিণডিহির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে সেখানে “সঙ্গীত নিকেতন” নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। রবিঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিদ্যালয়ের ক্লাস চলতো। আমি ছিলাম এই বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র। শুরুর দিকে অধ্যাপক সাধন রঞ্জন ঘোষ গানের ক্লাস নিতেন। পরে স্যারের ব্যস্ততার কারণে তার স্থলাভিষিক্ত হন তরুণ মজুমদার স্যার। আবৃত্তি শেখাতেন সবুর খান চৌধুরী। সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতেন আবুল বাশার টিটো। ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তহবিল থেকেই এটি পরিচালিত হতো। খোঁজ নিয়ে জেনেছি বিদ্যালয়টি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এটি চালু করার দাবি জানাই।
দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সটি শান্তিনিকেতনের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। তবে তদারকি আর অবহেলার কারণে সেই প্রকল্প আর এগোয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এই কমপ্লেকটিকে ঘিরে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না করলেও সময় একইবারে ফুরিয়ে গেছে তা নয়। সরকার যদি ইতিবাচকভাবে দক্ষিণডিহির দিকে নজর দেয় তাহলে এখনো সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ভারতে শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে আমরা পারবো না কেন?
কৃষ্ণ সেন: সঙ্গীত শিল্পী



