বাবা-মা ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা কোনো স্বত্ত্বা নন, তাই সন্তান হিসেবে তাদের ভুলগুলোকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে আমাদের। আর ঠিক তেমনি এই যুগের বাবা-মায়েদেরও গুড প্যারেন্টিং এবং ব্যাড প্যারেন্টিং সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।
পৃথিবীতে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে কোনো সম্পর্ক নেই। পৃথিবীতে এনেছেনই যে তারা! সারা পৃথিবী যতই রুঢ় হোক আমাদের সঙ্গে, আমরা জানি আমাদের বোঝার জন্য, মন দিয়ে কথা শোনার জন্য বাবা-মা আছেন। তারা ঠিক বুঝে নেবেন আমাদের ভেতরকার মানসিক দ্বন্দ্ব। মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইবেন আমাদের কষ্টের কারণ। সে কারণে সবার উপরে তাদের স্থান।
অসুখে-বিসুখে, রাত-দিন এক করে পাশে থাকেন বাবা-মা। শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত মা সেবা করে যান আর সহায়-সম্বল বিক্রি করে হলেও বাবা চিকিৎসার চেষ্টা করেন। এসব মাঝে মাঝেই অতিমানবীয় মনে হয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের এই সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, ভালোবাসার মানুষ, যে যার জায়গায় মহীয়ান, কিন্তু তারা মা-বাবার মতো হতে পারেন না। শত প্রতিবন্ধকতায়ও এই সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয় না।
আমরা এখানে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে সরাসরি কথোপকথনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব। বিশেষ করে বাবা-মাদের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। তাহলেই “ব্যাড প্যারেন্টিং” বিষয়টিকে পুরোপুরি এড়ানো যাবে। দায়িত্বশীল অভিভাবক হওয়া স্বত্ত্বেও অনেকের মাঝে ব্যাড প্যারেন্টিংয়ের অনুশীলন থাকতেই পারে। এই বিষয়টি আমাদের দেশের মানুষকে বোঝানো কঠিন। সে কারণেই তো “ব্যাড প্যারেন্টিং” বা “গুড প্যারেন্টিং”-এর কোনো পারিভাষিক শব্দই নেই। অথচ বহির্বিশ্বে এটি বহুল আলোচিত একটি বিষয়।
কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক-
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন কর্মজীবি মায়ের জীবন অনেক চ্যালেঞ্জিং। সে কারণে অনেক নারীই সন্তান জন্মদানের পর চাকরি ছেড়ে দেন। একসময় তারা সন্তান-সংসার নিয়ে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তনের কোনো চেষ্টাই করেন না। সন্তানের পাশে সার্বক্ষণিক থাকার জন্যই আর কখনো কাজে ফেরেননি বলে একসময় তারা নিজেকে স্বান্ত্বনা দিতে থাকেন। আসলে বাচ্চারা একটু বড় হলে তাদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা আঠার মতো লেগে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। বাচ্চারা যখন নিজে খাওয়া-গোসলের মতো প্রাত্যহিক কাজগুলো নিজ থেকে করতে শিখে যায়, তখন তাদের নিজের মতো বড় হতে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে শেখে।
এতে মা-ও ধীরে ধীরে অন্য কাজে যুক্ত হতে পারবেন, কিছুটা সময় নিজের জন্যও রাখতে পারবেন। অনেকে সন্তানের জন্য পুরো সময় করে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেন। এর ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয় না। সন্তান বড় হওয়ার পর অনেককেই তাই বলতে শোনা যায়, “তোর জন্য চাকরি, পড়াশোনা, প্যাশন সব ছেড়েছি, আর তুই এখন বেশি সময় বাইরে কাটাস, তোর কাছে এখন বন্ধুরা জরুরি, তুই এখন আমার পছন্দের বিষয়ে পড়বি না?...“
সসন্তানকে সময় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউননিজেদের বাবা-মা হিসেবে “অতি উত্তম” প্রমাণের জন্য সন্তানের ওপর এই ধরনের আবেগী অত্যাচার কোনোভাবেই করা উচিত নয়। অনুভুতির এই ভুল উপস্থাপন সন্তানদের ভবিষ্যত টানাপোড়েনের সময় ভালো কিছু বয়ে আনবে না। আপনারা বাবা-মা হিসেবে যতই অর্থ খরচ আর মুখে তুলে খাইয়ে দিন না কেন, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে বড় হওয়ার পর তারা অনেক বিষয়েই আপনাদের কাছে পরামর্শ নিতে চাইবে না, আপনাদের ওপর আস্থা রাখতে পারবে না।
এগুলো হলো ব্যাড প্যারেন্টিংয়ের একটি অংশ।
এবার দ্বিতীয় উদাহরণে আসা যাক।
আপনি চান সন্তান অনেক দূর এগিয়ে যাক। আর তাই সবকিছুতে “শ্রেষ্ঠ” হতে পারলেই ভালো হয়। প্রবল প্রতিযোগিতার এই যুগে এমন চিন্তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক ধরনের সহপাঠ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়াটাও প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে নিজেদের প্রশান্তির জন্য ছোট বয়স থেকেই সন্তানকে দিয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে গান, নাচ, আবৃত্তি ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করানোটাও ভুল। ধরুন, আপনার সন্তান ব্যাডমিন্টন খুব ভালো খেলে, সে এতেই আনন্দ পায়। কিন্তু আপনি ফরাসি ভাষার ক্লাস করাবেন বলে, সাঁতার শেখাবেন বলে ধমকে ব্যাডমিন্টন কোর্ট থেকে তুলে নিয়ে বললেন, “আমার টাকায় পড়িস আবার আমার অপছন্দের জিনিস করতে চাস? আমি যেটা শেখাব সেটাই তোর জন্য ভালো।“
কিন্তু বিষয়টা এমনটা নয়! আপনি আর আপনার সন্তান দুইজন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ। আপনার চেয়ে তার চিন্তা আর ভালোলাগার ধরনও ভিন্ন হতে পারে। কোনো কারণে আপনি চাচ্ছেন সে ব্যাডমিন্টনে মনোযোগী না হোক, তবে সেটা তাকে যুক্তি দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বোঝাতে হবে। শুধুমাত্র আপনার কথা বলার ভঙ্গি আর খোলামেলা আলাপই অনেক ক্ষেত্রে অশোভন আর অভিভাকত্বের অর্থহীন খবরদারি থেকে আপনাকে বাঁচাবে।
আবার গুড প্যারেন্টিং মানে এই নয় যে সন্তান ছোট থেকেই যখন-তখন যা চাইবে, তার সামনে হাজির করতে হবে, অথবা অবিবেচকের মতো চেয়েই যাবে, আর আপনি অসহায়ের মতো তা দিয়েই যাবেন। এমনটা হলে তা-ও বেশ ক্ষতিকর। শিশুকে কিছুটা হলেও বোঝাতে হবে, প্রতিটি জিনিসের পেছনে প্রচুর ত্যাগ নিহিত। আর কষ্টের বিনিময়েই ভালো ফল আসে। শিষ্টাচার, ভালো আচরণ, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি শেখানোর পাশাপাশি মানবিক গুণাবলির ওপরে প্রাধান্য দেওয়াটাও বেশ ফলপ্রসূ।
সবসময় সন্তানের বায়না শোনাও গুড প্যারেন্টিং না পেক্সেলসআবার ধরুন, আপনার শিশু অন্য একটি শিশুকে মারধর করে ঘরে ফিরল, তখন আপনি কোনো কিচু বিবেচনায় না নিয়ে আপনি তাকে বাহ্বা দিচ্ছেন এই বলে যে, “ছেলে মানুষ একটু-আধটু মারতেই পারে। কিছু হবে না।“ অথবা বললেন, “আমার মেয়ে এমন করতেই পারে না, আমার বাচ্চা শ্রেষ্ঠ।“ অথচ আপনি জানেন, দোষ আপনার বাচ্চারই। এই ধরনের বিচার কখনোই সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দেবে না। এগুলো ব্যাড প্যারেন্টিংয়ের অন্তর্ভুক্ত।
এবার আসা যাক পারিবারিক কলহের মাঝেও সন্তানকে সঠিকভাবে বড় করার আলোচনায়।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতের অমিল থেকে দ্বন্দ্ব হতেই পারে। চাইলেও হয়ত ঝগড়াঝাটি এড়ানো যায় না। সেক্ষেত্রে শিশুকে এ ঝামেলা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। সন্তান বড় হয়ে গেলে বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের বিষয়টি তার সঙ্গে বসে পরিষ্কার করতে হবে। সন্তানের সামনে পরস্পরকে ন্যূনতম সম্মানটুকু দেখাতে হবে। এটা খুবই জরুরি। কিন্তু পারিবারিক ঝামেলা খুব বেশি হলে, কোনো এক পক্ষের দোষ অনেক বেশি হয়ে গেলে, বারবার চেষ্টার পরেও ভীতিকর ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি না কমলে ভালো হয় আলাদা হয়ে গিয়ে বাবা-মা হিসেবে আলাদাভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা। সেক্ষেত্রেও জটিলতা থাকতেই পারে, কিন্তু আলাদা হয়ে গেলে অন্তত বাজে পরিণতি এড়ানো যায়। এতে করে সন্তানরাও শৈশবের তিক্ত ও অসুস্থ অভিজ্ঞতা থেকে রেহাই পাবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঝগড়াঝাটি, বাবা-মায়ের অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখে বড় হওয়া শিশুর মানসিক আলাদা হয়ে যাওয়া পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের চেয়ে খারাপ। কিন্তু আমাদের দেশের রীতি হলো যাই হয়ে যাক না কেন, যত ঝগড়াঝাটি, মারামারি, অশান্তি থাকুক, সন্তানের মুখ চেয়ে সংসার করে যেতেই হবে আমৃত্যু। কিন্তু আসলে এই নীতিকে শক্ত ভাবে ধরে না রেখে চিন্তাশীল উপায়ে সামলাতে হবে। সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবলে তাকে কোনোভাবেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা যাবে না। আর তাই ভাবতে হবে, বাবা-মা হিসেবে কীভাবে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা যায়। পরস্পরকে শ্রদ্ধা, সন্তানের খেয়াল রাখা এবং বাবা-মা হিসেবে পরস্পরকে বঞ্চিত না করে একসঙ্গে না থেকেও সহাবস্থান ধরে রাখা যায়। এটাও চমৎকার গুড প্যারেন্টিং এর অংশ।
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন একটি শিশু তার বাবা-মায়ের কাছে ভালোবাসা আর ভালো কাজে সমর্থন পেলে তা পুরো অভিভাবকত্বে ইতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তার মানে সন্তানকে ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত মুখে তুলে খাওয়ানো, তার সমস্ত দোষ অন্ধভাবে ক্ষমা করা, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে পছন্দের জিনিস কিনে আনা, পড়াশোনায় ফাঁকি সহ্য করা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধ না করা ইত্যাদি নয়।
মনে রাখতে হবে গুড প্যারেন্টিং মানেই অতিরিক্ত ভালোবাসা নয়। এই ধরনের খারাপ কাজকে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত।
সন্তানকে কাছে ডেকে কথা বলতে হবে, ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক আলোচনায় অভ্যস্ত করতে হবে, ধর্ম ও নৈ্তিকতাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে হবে। মানবিকতাকে পায়ের তলে দুমড়ে মুচড়ে তারপর ধর্ম কে মনের মধ্যে গাঁথন করার প্রয়াস ইত্যাদি গুড প্যারেন্টিং এর অংশ নয়।
শেষ কথা হলো, বাবা-মায়েরা বিষয়গুলো বুঝলে শিশু উদার মন নিয়ে বড় উঠবে। তার মন হবে কুটিলতা বর্জিত। এসব অনেক সম্ভাবনার দার খুলে যায় তখন ওই সব সন্তানদের ক্ষেত্রে। কিন্তু দিন শেষে সন্তানদের ও বড় হবার পর বাবা মাকে বুঝতে হবে, যে তারাও একই মাংসে গড়া মানুষ আর তাদেরও নিজেদের একটা জীবন, চাহিদা, আকাঙ্খা আছে। তবে জগতে বাবা মা ছাড়া একান্ত নিজের মনে করে হয়ত আর কেউ ভাবে না।
গুড আর ব্যাড প্যারেন্টিং নিয়ে অনেক বই, জার্নাল, আর্টিকেল আছে। সেগুলো পড়ে দেখা উচিত প্রত্যেক বাবা-মায়ের।
মেহনাজ পারভীন, লেখক
লেখক বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও অসমতা নিয়ে লেখেন, মানবতাকে সর্বাগ্রে গণ্য করেন। তিনি চার বছর শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।