বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আসার অল্প কিছু দিনের মধ্যে অন্য অনেকের মতো আমিও বুঝে গেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষমতা অসীমের কাছাকাছি। পৃথিবীটা যে কী ভীষণ সুন্দর এটা সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা একজন তরুণ-তরুণীকে অনুধাবন করানোর ক্ষমতা রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আবার পৃথিবীর কুৎসিত রূপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেও পারেন এই শিক্ষকরাই।
আপাতদৃষ্টিতে তাদের ক্ষমতা “আহামরি” মনে না হলেও একটু নিবিড় চিন্তা করলেই বোঝা যায়- একেকটা জীবন, একেকজন শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তাকে কেমন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তার ওপর।
আমার পৃথিবীটা কেমন জানেন?
ওপর থেকে দেখলে আমার পৃথিবীটা বেশ সুন্দর দেখানোর কথা। কিন্তু আমি কখনো তা দেখিনি। কারণ আমার অবস্থান উঁচুতে না। ভূমি থেকে ওপরে তাকিয়ে যখন দেখি, পৃথিবীটা কেমন অস্থির মনে হয়। এখানে কেউ মানুষ নয়। ঊর্ধ্বে ভগবান আর নিচে নিম্নশ্রেণির কিছু প্রাণী!
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে আমার মনে হতো আমি একজন মানুষ। কিন্তু আমার ভগবানেরা আমার এই “ভুল” ভাঙিয়ে দিয়েছেন।
প্রথম বর্ষে খুব পছন্দের এক শিক্ষক আমার ভগবান হয়ে যান। তিনি বলতেন, “তোমাদের ক্লাসই করতে হবে তা নয়, তোমরা বই পড়ো, সিনেমা দেখো, ভ্রমণ করো, এক্সপ্লোর করো।”
কথাগুলো এত ভালো লাগতো যে, অন্যদের দর্শনে খুব একটা না গেলেও এই ভগবানের ভজন শুনতে চলে যেতাম প্রায়ই।
মজার ব্যাপার হলো ইনিই একমাত্র ভগবান ছিলেন যিনি বলতেন, “তোমরা হাজিরার চিন্তা করো না, ও আমি দিয়ে দেবো।” হাজিরা নিয়ে যার কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না, তার কাছে হাজিরা দিতেই কীভাবে যেন সবচেয়ে ভালো লাগত। অথচ যেদিন হাজিরার তালিকা পেলাম অবাক হয়ে দেখলাম, আমার হাজিরা অনেক কম। ভগবানের কাছে গেলে তিনি বললেন, “তুমি যা ডিজার্ভ করো তার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে।”
খুব আহত হলাম। হাজিরার নম্বরের জন্য যতটা হয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছি আমার আসার আর কোনো জায়গা রইলো না বলে। ভগবানেরা বৈঠক করেন, সেখানে আলোচনা হয় যে কে কেমন ডিজার্ভ করে। সেই অনুযায়ী সবাই মূল্যায়ন করেন। সে নিচুতলার পুজারীর সঙ্গে কথা বলার সময় হোক, আর তাকে নম্বর দেওয়ার সময় হোক।
কিন্তু ওই ভগবান কোনোদিন জানলেন না এই ভক্ত অন্য ভগবানদের হাজিরায় কম ডিজার্ভ করলেও সে আসলেই তার ভক্ত ছিল। কেবল “ফেসভ্যালু” দিয়ে বাকিরা যাচাই করলেও এই ভগবান তা কোনোদিন করবেন না, এই বিশ্বাস নিয়ে তার বেশিরভাগ ভজনে হাজির থাকত এই নিম্নশ্রেণির প্রাণীটা।
যখন ইচ্ছে হয় ভজনের সময় দিয়ে আবার পেছানো, এমনকি বাতিল করা এসব অনিয়ম দেখে উপস্থিতি বাদ দেওয়া আমি একসময় বুঝতে পারলাম শরীরের সব ইন্দ্রিয় বন্ধ করে হলেও ভজনে বসে থাকলে ডিগ্রি অর্জনের পুলসিরাত পার করা যায়। আমি তাই শুরু করলাম।
একজন ভগবান আছেন নতুন এই লাইনে এসে খুব ভালো ভালো কথা বলেছিলেন। অনেক অনিয়ম হয়, তিনি সেসব বদলাতে চান। এরপর আরও কয়েক দিন তাকে ক্লাসে দেখা গিয়েছিল। সেই শেষ। অনেক দিন হলো তাকে দেখা যায় না। দেশেই আছেন। আমাদের কিছু কিছু ভজন দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার ওপর সময়ে সময়ে। দৈবলোকের লোকজনের দেখা পাওয়া যে অত সোজা না তা এই ভগবানের সান্নিধ্যে এসে খুব ভালো বুঝতে পেরেছি। অথচ পুলসিরাতের কোনো এক পর্বের চূড়ান্ত পরীক্ষার দিন তিনি ভগবান হওয়ার ট্রাম্প কার্ড ব্যবহার করে আমাকে বলেছিলেন, “তুমি তো ক্লাস করো না।” কে ক্লাস করে আর কে ক্লাস করে না তা জানার জন্য ভগবানদের ক্লাসে আসতে হয় না। তাদের কাছে “ফেসভ্যালু” নামের একটা তরিকা আছে। সেটা দিয়েই তারা নির্ধারণ করেন হাজিরার নম্বর কার প্রাপ্য, আর কার না।
শুধুমাত্র ফেসভ্যালুর জন্য আমাকে “আপনি/তুমি তো ক্লাস করেন/করো না” শুনতে হয়েছে একাধিকবার। প্রথম বর্ষে যেহেতু একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে, “এই মেয়ে ক্লাস করে না, এই মেয়ে এমন-অমন-সেমন”, তাই এই মেয়ে আসলে কেমন এটা কোনোদিন কারও জানা হয়নি; হবে না। নিম্নশ্রেণির প্রাণীদের বিষয়ে না জানলেও চলে।
সম্প্রতি আমরা স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তরে উঠেছি, ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে ওঠার মতো। ফাইভ আর সিক্সের মধ্যে যেহেতু খুব বেশি দূরত্ব নেই, তাই প্রাথমিকের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানোই যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিক্সে পড়ার সময়ে তার শিক্ষকের করে দেওয়া স্লাইড নিয়েই ক্লাস নিয়ে ফেলতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামের বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা নামের ক্লাস সিক্সের শিক্ষক ফাহমিদুল হক যেহেতু ভালো শিক্ষক ছিলেন, তার শিক্ষার্থী নিজে শিক্ষক হয়ে গুরুর স্লাইড ব্যবহার করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নামের বিদ্যালয়ে একই রকম ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের পড়াতেই পারেন। আর পরীক্ষার সময় ক্লাস ফাইভে যেমন ছবি কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী প্রশ্ন করা হতো,এখানেও একই রকম প্রশ্ন করাই যায়।
এর চেয়ে অ্যানালিটিক্যাল প্রশ্ন করতে পারেন কি পারেন না এই বিবেচনা না করলেও চলে। কারণ তারা ভগবান। ভগবান হোয়াইট বোর্ডে একটা গৎবাঁধা প্রশ্ন করছেন, এই তো অনেক। এই একটা প্রশ্ন লিখতে গিয়ে তার তিনবার ডাস্টার ব্যবহার করতে হয়েছে, এ অবশ্য তেমন কিছু না।
ভগবান যা ইচ্ছা করতে পারেন। যখন ইচ্ছা আমাদের মানুষ ভেবে ভালো আচরণ করতে পারেন। আবার আমরা নিজেদের “মানুষ” ভেবে মানুষের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন করলে নিম্নশ্রেণির প্রাণীর কাতারে ছুঁড়ে ফেলতে পারেন।
ভগবান তারিখ দিতে পারেন, সে তারিখ যতবার খুশি বদলাতে পারেন।
ভগবান সারা বছর নিজের মতো জীবনযাপন করে সময়সীমার আগে আমাদের বলতে পারেন, “সামনে ডেডলাইন। এই অল্প কিছুদিনের মধ্যে সব ভজন মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতে হবে। তারা শান্তির আলয়ে থাকেন। হল/মেস থেকে দূরে তীব্র গরমে, রোজা রেখে স্বল্প রিকশার এ নগরে জীবন কেমন হতে পারে, তা তাদের বিবেচনা না করলেও চলে। কারণ এ জীবন তো নিম্নশ্রেণির প্রাণীর; এ সম্পর্কে জানার দরকার কোনোদিন তাদের হবে না। সবসময় ভদ্রপল্লীতেই থেকেই তারা নিয়ন্ত্রণ করে যাবেন এই নিম্নশ্রেণির প্রাণীদের জীবন।
নিম্নশ্রেণির এই প্রাণীগুলো যে সব সময় একই অবস্থানে থাকতে চায় তা কিন্তু না। তারা মাঝে মাঝে অধিকার সচেতন হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু কিছুটা উঠে দাঁড়াতেই তাদের মনে পড়ে পুলসিরাতের কথা। পুলসিরাত কমিটির সভাপতি তো এই ভগবানেরাই! সুতরাং তাদের নারাজ করা যাবে না। তাই মানুষ হয়েও মেরুদণ্ডহীন নিম্নশ্রেণির প্রাণী সেজে থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের অসীমের কাছাকাছি ক্ষমতা দিয়ে চাইলেই সদ্য কৈশোর পার করে আসা তরুণ-তরুণীর পৃথিবীটা খুব সুক্ষ্মভাবে বিষাক্ত করে দিতে পারেন; এতটাই বিষাক্ত যে কখনো কখনো তরুণদের ইচ্ছে হয় এই সব ছেড়ে চিরতরে চলে যাই। কিন্তু তবু তাদের বেশিরভাগই রয়ে যায় এই বিষাক্ততার মধ্যেই; কারণ, হয়তো সইতে সইতে তাদের সহনশীলতার মাত্রা এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায়।
তাসনুভা তাজিন ইভা
শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।