এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে কিছু কথা

ডিক্টেটর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ৮৯ বছরের দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন। ২০১৯ সালের আজকের দিন ১৪ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার শাসনামলে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রতিবাদী নূর হোসেনের জীবনের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র ২৬ বছর। প্রায় একইভাবে শহীদ হওয়া ডা. শামসুল আলম খান মিলন বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৩ বছর। যে হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার এত দিনেও হয়নি। তাই এরশাদ মানেই যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিচারহীনতার বিচিত্র সার্কাস।

সংবিধান ছুড়ে ফেলে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানে এরশাদ নিজেকে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনেস্ট্রেটর হিসেবে ঘোষণা করেন। দেশে বাতিল হয় সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম। রাষ্ট্রপতি পদ তিনি কব্জা করেন ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। এরপর ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ পর্যন্ত চলে তার “নতুন বাংলাদেশ, গড়ব মোরা” পর্ব। 

যে শাসনামলে বাংলাদেশে দেখেছে অভূতপূর্ব অর্থ পাচার, রাষ্ট্রধর্মের মতো আজব বিষয়, সেনা গোয়েন্দাদের দিয়ে ভিন্নমত দমন আর ব্যক্তি এরশাদের লাম্পট্যের বিরামহীনতা। 

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, “১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মরিয়ম মমতাজ নামে এক নারী নিজেকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে দ্য অবজারভার পত্রিকাকে বলেন, জেনারেল এরশাদ আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় এসোসিয়েটেড প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট সহ নানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের শিরোনাম হয়েছিল।”

৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ পর্যন্ত এরশাদ জেলে ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১ মার্চ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এরশাদের এই কারাবাসকে “অবৈধ” ঘোষণা করে। যদিও এর আগেই তার কৃতকর্মের জন্য একটি মামলায় এরশাদ ১১ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। 

দায়মুক্ত থাকা এ ডিরেক্টর প্রসঙ্গে প্রখ্যাত আইনজীবী ড.শাহদীন মালিক বলেছিলেন, এরশাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ তার কাছে অজানা মনে হয়।

সব সম্ভবের দেশে গণ-অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া স্বৈরাচার রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠেন ৯০ উত্তর সময়ে। “এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই করে যাবি”- স্লোগান যেন সত্য হয়। এক ব্যক্তি এরশাদ চলে যান। কিন্তু বহাল থাকে একই শাসন ব্যবস্থা।

এরশাদ কখনো ভোটে হারেননি। আমৃত্যু তিনি ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। “দশম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধীদল ছিল তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদেও জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে। দশম জাতীয় সংসদে এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদমর্যাদায় ছিলেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে তাকে বিরোধীদলীয় নেতার পদে বসান।”

১৪ জুলাই ২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।”

তাই এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে রাজনীতিবিদদের “আঁতাত” ভিন্ন অন্য কোনো শব্দ মাথায় আসে না। একই সঙ্গে এ দিন আমাদের মনে করায় জাতি হিসেবে আমাদের বিস্মৃতিপরায়নতা। আর দফায় দফায় ক্ষমতায় আসীন হওয়াদের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা? এর সুস্পষ্ট জবাব হয়তো একদিন ইতিহাসই দেবে।  


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।