মেধাকে অস্বীকার করে কোনো দেশ ও জাতি অগ্রসর হতে পারেনি। আমাদের দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর কারণ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতাসহ বিকশিত হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। উন্নত দেশের গবেষণা, প্রযুক্তি আর স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের মেধাবী সন্তানরা সেসব দেশকে আরও শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী করেন। আর দেশ হারায় তার সবচেয়ে মেধাবী, জ্ঞানী, দক্ষ ও যোগ্য নাগরিককে। সম্ভাবনাময় এ তুখোড় প্রজন্মকে হারিয়ে নিজ দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতি যাত্রায় বাধার সম্মুখীন হয়।
বর্তমান সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মেধা পাচার একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ সমস্যাটি একটি জাতির উন্নয়নকে পশ্চাৎপদ করে দিতে পারে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও মেধা পাচারের ঘটনা প্রতি বছরই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বাংলাদেশের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অন্তরায় এদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারা, মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারা। বিজ্ঞানের অগ্রগতির এ যুগে যখন বিশ্বের অনেক দেশই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এবং বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন প্রণোদনা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে, তখন আমাদের দেশ বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না। সৃজনশীল গবেষণা খাতে নেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বরাদ্দ। মেধা ও পারদর্শিতা থাকলেও উদ্ভাবনের সুযোগ পাচ্ছেন না এদেশের অসংখ্য সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানী। ফলে ঘটছে অনিবার্য মেধা পাচার।
মনে আছে গাড়ির জাদুকর নিজামউদ্দিন আউলিয়া ‘‘লিপু’’র কথা? তিনি আজ বিশ্বব্যাপী মোটরগাড়ি ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার ও কোচবিল্ডার হিসেবে সমাদৃত। যখন বিশ্বের নামকরা সব প্রতিষ্ঠান উচ্চ বেতনে চাকরি এবং লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল, তখন সব ছেড়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন ছোট পরিসরে একটি গাড়ির মডিফিকেশন গ্যারাজ। পুরোনো মডেলের যেকোনো গাড়িকে নতুন মডেলের রূপান্তর করার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। দুঃখজনক হলো তিনি টিকতে পারেননি নিজ দেশে। রাতে তার গাড়ির টেস্ট ড্রাইভের জন্য উচ্চ শব্দ, গাড়ির নম্বর প্লেট না থাকায় পুলিশের হয়রানি এসব জটিলতায় বিরক্ত হয়ে আবারও ফিরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এভাবেই পাচার হয়ে গেল আমাদের আরেকটি মেধাবী মানুষ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এক ছাত্রী তানিয়া আহমেদ। নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলেও তাকে নিয়োগ করা হয়নি। কেননা তার সহপাঠী এক ছাত্র রাজনৈতিক দলের বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়োগ দেয়; যদিও নিয়োগপ্রাপ্ত সেই মানুষটি টেনে-টুনে পাশ করেছিলেন। তানিয়া ক্ষোভ ও অপমানে সুইডেনে স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান। লুন্ড ইউনিভার্সিটিতে মেধার স্বাক্ষর রেখে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসাবে আদায় করে নেন শতভাগ ফ্রি স্কলারশিপ। বর্তমানে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি হয়তো এতদিনে সুইডিশ নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছেন।
আমার খুব কাছের এক ছোট ভাইয়ের কথা বলি, সে ঢাকা মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছিল। একবার এক রোগীর সঙ্গে আট থেকে দশ জন আত্মীয় এসে জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় করে। এভাবে ভিড় না করার অনুরোধ জানানোয় রোগীর স্বজনদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রোগীর এক আত্মীয় তাকে চড় মেরে বসে এবং তার সহকর্মী এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককেও হেনস্তা করে। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর সে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যায় এবং সেখানেই স্থায়ী হয়ে কর্মজীবন শুরু করে। বন্ধুরা মজা করে একদিন তাকে বলেছিল, কিরে! এক থাপ্পড় খেয়ে দেশ থেকে চলে গেলি? এখানে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। সে কি আদৌ থাপ্পড় খেয়ে দেশ থেকে চলে এসেছে, নাকি তাকে অপমান করার পর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা তাকে দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে?
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, শিক্ষকদের রাজনীতিসহ নানাবিধ কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছাত্রাবস্থায় মেধাবীদের এক বিশাল অংশ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। একসময় তারা চলেও যায়। এতে করে তারা শুধু বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে তা-ই নয়, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে অপার সম্ভাবনাময় মেধাও। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশে যদি তার যোগ্যতা অনুসারে কর্মক্ষেত্র ও নিরাপত্তা না পান, তখন তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করবেই। প্রসঙ্গ যখন সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য কেউ যদি বিদেশে গমন করেন, তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় কি? আমরা মাঝে মধ্যেই তাদের কটাক্ষ করে বলে থাকি, তারা স্বার্থপরের মতো দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে বিদেশে পাড়ি জমায়। আদতে মেধাবীরা দেশ ছাড়তে চান না, পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
এ মেধাবী সন্তানরা অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন না। তাহলে যারা এভাবে চলে যাচ্ছেন, তাদের আফসোসটা ঠিক কোথায়? কোন কষ্টে তারা নিজের জন্মভূমি তথা শেকড় ভুলে থাকতে পারছেন? সেই কষ্টকে উপলব্ধি করতে হবে। পুরো ব্যাপারটাকে হালকাভাবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির অনিয়মে পরাজয় ঘটেছে মেধার। ক্ষমতার দাপট, অর্থের লেনদেনে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়ে চলেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে রাজনীতির ছোঁয়া নেই। শিক্ষক হতে চাইলেও ছাত্র রাজনীতির ক্ষমতা নয়, যোগ্যতা ও গবেষণার মানই সেখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় আর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষকরা দিন-রাত কাজ করেন আবিষ্কারের নেশায়।
আজ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নৈতিক অবক্ষয় আজ দেশকে এত বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে।
ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবী ও লেখক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।