শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে নয়টি নবজাতক এবং একজন মায়ের মৃত্যু হয় গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায়। হিসাব অনুযায়ী, এই বছর বিশ্বে ২৪ লাখ নবজাতক শিশু তাদের জীবনের প্রথম মাসের মধ্যে মারা যেতে পারে এবং গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত জটিলতায় মৃত্যু হতে পারে ২ লাখ ৯৫ হাজার নারীর।

এই ২৭ লাখ মৃত্যু এক বৈশ্বিক ভয়াবহতাকে তুলে ধরে, যা পরিবার ও সমাজের জন্য অপরিমেয় ক্ষতির কারণ। এসব মৃত্যু সামাজিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্বের নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এসব মৃত্যুজনিত বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের বার্ষিক জিডিপি'র ৬%।

২০১৫ সালে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশের জন্য বিশাল উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) হিসেবে পরিচিত। যেখানে ক্ষুধা, শান্তি, শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রধান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে আমরা এখনও অনেক দূরে।

আবার, অন্যান্য খাতের চেয়ে মা এবং নবজাতক শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টির অগ্রগতি অনেক ধীরে ঘটছে। বর্তমান হার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার মা এবং ৯ লাখ শিশুর মৃত্যু হবে, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে এতো মৃত্যু দেখতে হতো না।

বিষয়টি আসলে এভাবে বাস্তবায়িত হবে না। এসডিজি অর্জনে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারগুলো কিছু নীতিতে মাঝারি আকারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বাকি সময়ের মধ্যে এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতের অগ্রগতি দেখতে চান। সে লক্ষ্যে সবচেয়ে কার্যকর নীতি চিহ্নিতকরণের জন্য তারা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করেছেন। যার মধ্যে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

প্রতীকী ছবি/পেক্সেলস

এই সপ্তাহে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের আশ্চর্যজনক সুফল দেখা গেছে। জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি এই খাতের প্রতি এক ডলারের বিনিয়োগের বিপরীতে ৮৭ ডলারের সামাজিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব বলে দেখেছেন কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা মা ও নবজাতকের মৃত্যুর হার বেশি এমন ৫৫টি দেশের ওপর জোর দিয়েছেন। এসব দেশে গর্ভাবস্থায় নারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা, আয়রন ও পরিপূরক খাবার সরবরাহ নিশ্চিত এবং শিশু জন্মের পরে মায়েদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ গবেষকদের।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, পরিবার পরিকল্পনার পরিসর বাড়ানো সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ এবং  গর্ভাবস্থায় ও শিশুর জন্মের পরবর্তী সেবার (বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ার) পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ার সেবার  উদ্দেশ্য হলো- হল কম খরচে ভালো সেবা দেওয়া, যেখানে ব্যয়বহুল চিকিৎসকের পরিবর্তে বেশিসংখ্যক নার্স ও মিডওয়াইফদের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা হয়।

বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ার নবজাতকের শ্বাস চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর জন্য শুধুমাত্র একটি হ্যান্ড পাম্প বা রিসাসিটেটর প্রয়োজন, যার দাম প্রায় ৬৫ ডলার। যদি এটি বছরে ২৫ বার ব্যবহার করা হয়, তবে প্রতি ব্যবহারের খরচ মাত্র ২.৬ ডলার। স্বাস্থ্যকর্মীর পারিশ্রমিক যোগ করলে, একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর মোট খরচ হয় ৫ ডলার।জন্মের পরপরই কৃত্রিম এই শ্বাসপদ্ধতি শিশুর মৃত্যু ৩০% হ্রাস করে, যা নবজাতকের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ারের আওতায় আরেকটি উদাহরণ হলো- ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার। এটি মা এবং শিশুর মধ্যে ত্বক থেকে ত্বকের যোগাযোগ ত্বরান্বিত করে, ফলে শিশুর অকাল মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।

সৌজন্য ছবি

বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ার মা এবং শিশু উভয়ের মৃত্যুঝুঁকি কমায়। বর্তমানে, উল্লিখিত ৫৫টি দেশের দুই-তৃতীয়াংশ নারী এই ধরনের সুবিধায় সন্তান প্রসব করেন। গবেষকদের প্রস্তাব, ৯০% নারীর জন্য এই সুবিধা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়ানো।

এই প্যাকেজে পরিবার পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, বিশ্বে ২১৭ মিলিয়ন নারী এখনও নিরাপদ এবং কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির সুবিধাবঞ্চিত। যদি ওই ৫৫টি দেশে ৯০% নারীর জন্য এই সুবিধা নিশ্চিত করা যায় তাহলে প্রতিবছর কমপক্ষে ৮৭ হাজার নারীর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

এই প্যাকেজে বার্ষিক আর্থিক খরচ ২.১ বিলিয়ন এবং নারীদের ব্যয়িত সময় বাবদ খরচ ১.৬ বিলিয়ন। অর্থাৎ বছরে মাত্র ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৫৫টি দেশে ১ লাখ ৬১ হাজার মা এবং ১ লাখ ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

স্বাস্থ্যবান শিশুর ভবিষ্যৎ সুন্দর, তারা দেশের জন্য সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সহজেই। লাখ লাখ শিশুর জীবন বাঁচানো গেলে তা মাথাপিছু আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। এটি “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” নামে পরিচিত। শিশুমৃত্যু রোধ করা গেলে বার্ষিক ২৮ বিলিয়ন ডলার আয় বাড়বে।

সার্বিকভাবে মাতৃ এবং শিশুমৃত্যু রোধে বার্ষিক ৩.৭ বিলিয়ন ব্যয় প্রতি বছর ৩২২ বিলিয়ন ডলারের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনে দেবে।

বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোতে মা ও শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি, এবং এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বেসিক ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক এবং নিউবর্ন কেয়ার এবং পরিবার পরিকল্পনায় বার্ষিক মাত্র ৩.৭ বিলিয়ন একদিকে যেমন খুব অল্প পরিমাণের বিনিয়োগ। অন্যদিকে, এটি বিশ্বব্যাপী আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে একটি সেরা উপায়।

ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।

এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের তৃতীয় অংশ। সিরিজের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশ পড়ুন যথাক্রমে-

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব