পহেলা বৈশাখকে বাংলাদেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব বলা যায়, যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মিলনমেলা ঘটে। কিন্তু পহেলা বৈশাখ এলেই আমাদের দেশের একটি গোষ্ঠী এর বিরোধিতায় তৎপর হয়ে ওঠে। সবকিছুতে ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত না করলেই যেন নয়! পহেলা বৈশাখের মত ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়েও আলেমদের আপত্তি রয়েছে।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে যদি নামাজ আদায়ের বা রোজা রাখার বা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের শর্ত যুক্ত করা হতো, তাহলে বিদআত আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করার ক্ষেত্র বিবেচনা করা যেত। কিন্তু যে উৎসবে ধর্মের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই সেখানে ইসলাম বিরোধিতা অনুসন্ধান করা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলাম ও সংস্কৃতি
ইসলামের সঙ্গে প্রথা, প্রচলন, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বিরোধ থাকার কোনো কারণ নেই। পোশাকের উদাহরণ দেওয়া যায়। মধ্যপ্রাচ্যের পোশাক মরুভূমির আবহাওয়া ও পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত। অনেকে এ ধরনের পোশাককে “ইসলামি পোশাক” ভাবতে পারে কিন্তু এমন ভাবনা সঠিক নয়। ইবনে তাইমিয়ার অভিমত হচ্ছে, অন্যান্য দেশের নাগরিকদের উচিত তাদের প্রচলিত পোশাক পরিধান করা।
উৎসব একটি জাতি বা গোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অংশ। ইসলাম পূর্ব সময়ে আরবে বিভিন্ন ধরনের উৎসব পালন করা হতো। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা তৎকালীন আরবদের দ্বারা পালন করা হত যা ইসলামের উৎসব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নতুন কোনো দিন বা উৎসবের প্রচলন করায় আলেমদের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কোনো উৎসবকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেওয়া মোটেই যৌক্তিক নয়।
নওরোজ ও জাতীয় দিবস পালন
নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে উৎসব পালন করার রেওয়াজ পৃথিবীর বহু দেশে দেখা যায়। ইরানে সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে নওরোজ উৎসব পালন করা হয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তান সহ ৩০টিরও অধিক দেশে এই নওরোজ উৎসব পালন করতে দেখা যায়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন দিবস পালন করা হয়। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে ধর্মের সামঞ্জস্য বা বৈরিতা খোঁজা হয়নি। সম্প্রতি সৌদি আরবে হ্যালোইন উৎসবও পালিত হয়েছে। অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে বুঝি ইসলাম নেই!
পাকিস্তানে নওরোজ উৎসবের সাংস্কৃতিক আয়োজন। এই উৎসব পেয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা/ইউনেস্কোআমরা চলছি উল্টোরথে
ইসলাম প্রচারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মূর্তি, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম ইত্যাদি নিয়ে বিধিনিষেধ ছিল। মূর্তি পুজায় অভ্যস্ত অধিবাসীদের জন্য কবর জিয়ারতও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এসব বিধিনিষেধ আর প্রযোজ্য হয়নি যা মুসলিম শাসকদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয়। বিশ্বের প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম শিক্ষার অনুসঙ্গ হিসেবে স্থান পেয়েছে। বিতর্কের বেড়াজালে আটকে আছি কেবল আমরা।
ইবাদত বিষয়টি আধ্যাত্মিক। এতে উদ্দেশ্য, সংকল্প, অভিপ্রায় তথা নিয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইনটেনশন বাদ দিলে নামাজ দৈহিক কসরত ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু তথাকথিত আলেমদের কাছে বোধহয় ইনটেনশন মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারও শিরকের ইচ্ছা বা মানসিকতা না থাকলেও শিরকের অপবাদ চাপিয়ে দেওয়া হবে। হাতি বা ঘোড়ার মূর্তি দেখে কেউ সেগুলোকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে না। কিন্তু যে ভাষায় ওয়াজে বক্তব্য দেওয়া হয় তাতে মনে হবে- ওনারা বোধহয় ভাস্কর্য বা চিত্রকর্ম দেখা মাত্রই এগুলোর উপাসনা করা শুরু করেন, তাই এত ভয়!
বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় বয়ান
সম্প্রতি ১৫ রমজানে বিকট শব্দে ৭০ হাজার লোকের বধির হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করেছেন কয়েকজন ওয়াজ বক্তা। এর আগেও ইমাম মাহদির আগমন এবং কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার দিন তারিখ উল্লেখ করে বয়ান করা হয়েছে। অথচ ইসলামে ভবিষ্যদ্বাণী করা নিষেধ, যাচাই করা ছাড়া সংবাদ প্রচার করা নিষেধ। এই মৌলিক শিক্ষাগুলোই তথাকথিত আলেমরা অনুসরণ করে না।
একদিকে বলবে, ইফতারের সময় দশ লাখ জাহান্নামিকে জান্নাতে নেওয়া হয়, এটা করলে জান্নাতি, ওইটা করলে জান্নাতি। আরেকদিকে উঠতে-বসতে শিরকের অভিযোগ তোলা হবে। কিছুদিন আগে একজন খতিব ও ইমাম সাহেব ইবনে ওমরের বক্তব্য উল্লেখ করে স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে ইফতার করার উদাহরণ দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। রাসুল (সা.) বর্ণিত হাদিসের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও শুধু একটি হাদিস বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। অথচ ইবনে ওমরের বক্তব্য চালিয়ে দেয়া হয়েছে ইসলামের সুন্নত নামে।
উগ্র বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ রয়েছে ওয়াজ বক্তা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে/ফাইল ছবি
অন্যদিকে জনগণের কথা তো বলাই বাহুল্য। তাদের দৃষ্টিতে রাস্তায় শরিয়ত বহির্ভূত ও লোক দেখানো নামাজ আদায়ও পূণ্যের কাজ। পহেলা বৈশাখে চার রাকাত নামাজ আদায় করার বিধান করা হলে আমজনতা এই বিদআতকেই ইসলাম হিসেবে গণ্য করবে। তাই দেখা যায় হুজুররা ভুল বললেও তাদের সাফাই দিতে দাঁড়িয়ে যান অনেকে। কিন্তু এসবের ফলে কী ক্ষতি হচ্ছে তা বোধহয় এখনো অনেকে অনুধাবন করতে পারছেন না।
লক্ষ্য করলে দেখবেন ইসলাম নিয়ে পাঁচ-ছয় বছর আগে যে উদ্দীপনা ছিল, তা এখন আর নেই। ওয়াজ শোনার জন্য ইউটিউবমুখী হওয়া জনগণ ধীরে ধীরে হুজুরদের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছে। তাদেরকে কৌতুকাভিনেতা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মামুনুল হক, রফিকুল ও ইব্রাহিমসহ কয়েকজন হুজুরের গ্রেপ্তারকে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরাও অন্যায় কিছু ভাবেনি, স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে।
কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল আচরণের প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। আগে গুটিকয়েক অবিশ্বাসী ইসলাম নিয়ে ট্রল করত। এখন বিশ্বাসীরাও হুজুরদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ট হয়ে ট্রলের পথ বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের তথাকথিত রক্ষকদের কাছেই ইসলাম সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিতদের কাছে ধর্ম, দেশ, শিক্ষা বা সংস্কৃতি কিছুই নিরাপদ নয়। বিশেষত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির ফলে ক্ষতি শুধু ধর্মেরই হয়।
আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।