বিশ্বজুড়ে শিশুদের শিক্ষাখাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি কেউই এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করবেন না। এটা খুবই সাধারণ বিষয় যে, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাওয়া মানে শিশুদের জীবনের একটি ভালো সূচনা। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, শিক্ষাখাতে বিনোয়োগের কার্যকর ব্যবহার আমরা খুবই কম দেখতে পাই।
২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে বিশ্বনেতাদের ঘোষিত “শিশুপ্রতি একটি ল্যাপটপ” প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলেছিল। বলা হয়েছিল, একটি ল্যাপটপ বিশ্বকে বদলে দিতে পারে। তবে চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষে দেখা গেছে, "একাডেমিক অর্জন বা জ্ঞানীয় দক্ষতার” ওপর এর কোনো প্রভাব ছিল না।
যেকোনো ভালো উদ্দেশ্য বাস্তবাযনের জন্য ভালো পরিকল্পনা জরুরি। ভারত মাত্র ৭ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ৭১% বাড়িয়েছে, কিন্তু দেশটিতে ছাত্রছাত্রীদের পড়ার দক্ষতা এবং গণিত পরীক্ষার নম্বর আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাখাতে ব্যয় দ্বিগুণ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কার্যত শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়নি।
বেশরিভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দেশের সরকার শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধির অংশ হিসেবে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো কিংবা আরও স্কুল তৈরির পেছনে ব্যয় করে থাকে, শিক্ষার মনোন্নয়নের বিষয়টি থেকে যায় অবহেলিত। অনেক দেশই আবার শিক্ষাখাতের উন্নয়নে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তবে, বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় শিক্ষাখাতে এসডিজি অর্জন করতে কমপক্ষে আরও পঁচিশ বছর বেশি লেগে যাবে।
এসডিজিতে প্রতিশ্রুত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্ততন, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্জন প্রকৃতপক্ষে এখনও শূন্য। এসডিজিতে মোট ১৬৯টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতোবেশি প্রতিশ্রতি থাকার ফলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলাদাভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এই বছর আমরা এসডিজির অর্ধেক সময় পার করছি, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্ধেকের থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় কোন খাতে খরচ সবচেয়ে ফলপ্রসূ তা নির্ধারণ করতে বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করছেন।
বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি ভয়াবহ সমস্যা। এসব দেশের শিশুরা স্কুলে পড়লেও শিখছে কম। প্রায় অর্ধ বিলিয়ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৮০% শিক্ষার্থীর ন্যূনতম পড়ার দক্ষতা এবং গণিত দক্ষতা একেবারেই হতাশাজনক। এই পরিস্থিতিতে বিশেষ কোনো বিষয়ে সামান্য দক্ষতা অর্জনের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলারের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে স্মার্ট এবং কার্যকর নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
আমাদের গবেষণায় এমন দুটি সাশ্রয়ী নীতি দেখানো হয়েছে, যার ফলাফল আশ্চর্যজনক।
আমাদেরে দেখানো প্রথম পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীদের আরও কার্যকরভাবে শিখতে সাহায্য করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণত নয় বছরের শিশুদের একটি গ্রেডে, দশ বছর বয়সীদের পরের গ্রেডে, একইভাবে অন্যান্য বয়সীদেরও বিভিন্ন গ্রেডে পড়ানো হয। এসব শ্রেণিকক্ষে প্রচুর পরিমাণে শিক্ষার্থী থাকায় শিক্ষকরা সবার দিকে সমান মনোযোগ দিতে পারেন না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি স্কুলের প্রতি অনাগ্রহ বাড়ে।
এই সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকর উপায় হলো ট্যাবলেট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের দিনে এক ঘণ্টা করে শেখানো। বিদ্যমান শিক্ষামূলক সফ্টওয়্যারের সাহায্যে ট্যাবলেটের মাধ্যমে দ্রুত শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতা মূল্যায়ন করে ঠিক সেই গ্রেডের শিক্ষাদান করা হয়। দিনে এক ঘণ্টা করে শিক্ষার্থীদের তার উপযুক্ত গ্রেডের শিক্ষাদান শেখার দক্ষতা বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত যা শিখতে একজন শিক্ষার্থীর তিন বছর সময় লাগে, এই প্রক্রিয়ায় সে তা মাত্র এক বছরে শিখতে পারে।
দ্বিতীয় প্রমাণিত কৌশল হলো "কাঠামোগত শিক্ষাদান", যা শিক্ষকদেরকে আরও ভালোভাবে শেখানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে। কেনিয়ায় এ সংক্রান্ত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া গেছে। এই পদ্ধতিতে পুরো বছরের শিক্ষণ পরিকল্পনা, কোচিং এবং উৎসাহমূলক পাঠ্য বার্তার পাশাপাশি শিক্ষকদের আরও আকর্ষণীয় এবং দরকারী নির্দেশিকা প্রদানে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা সাধারণ ব্যবস্থার তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত শিখছে।
শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ শুধুমাত্র একটি শিশুর আজীবনের সম্ভাবনাই বাড়ায় না বরং একটি দেশের সমগ্র অর্থনীতিকে উপকৃত করে। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে প্রস্তাবিত এই দুটি নীতি কার্যকর করতে ১০ বিলিযন মার্কিন ডলার খরচ হবে। তবে এর বিপরীতে ৬০০ বিলিয়নের বেশি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উত্পাদনশীলতা বাড়বে। অর্থাৎ, এই খাতে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৬৫ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে।
শিক্ষার উন্নতির জন্য শত শত বিলিয়ন ব্যয় করার বর্তমান প্রতিশ্রুতির চেয়ে এটি অনেক ভালো নীতি।
শিশুদের উন্নত ভবিষ্যতের জন্য তথা বৈশ্বিক উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যত সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে এখনই আমাদের সবচেয় কার্যকর নীতিতে বিনিযোগ করতে হবে। এক্ষেত্রে ফলাফল বিবেচনায় ১০ বিলিয়ন ডলার খুব বেশি নয়। তাই এই বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া খুব জরুরি।
ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।
এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-
- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব
- এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব
- শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে
-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে
-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান
-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি
-এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে
-মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা এখন অতীত?
-উন্নয়নের জন্য ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি