সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে নিতে হবে যেসব বৈশ্বিক পদক্ষেপ

বিংশ শতাব্দিতে তামাক সেবনের ফলে বিশ্বজুড়ে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ধনী দেশের। তবে সেই চিত্র এখন কিছুটা বদলে গেছে, ধূমপানের ভয়াল থাবা উচ্চআয়ের দেশগুলো থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ধাবিত হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ধূমপানের ফলে একবিংশ শতাব্দিতে এক বিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

তামাক, অ্যালকোহল এবং লবণের মতো স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরুপ বিষয়ে উন্নত দেশগুলোতে অনেক কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দরিদ্র দেশগুলোতে সংক্রামক রোগ নির্মূলে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। অসংক্রামক রোগ নিমূর্লে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য তহবলির ক্ষুদ্র অংশ ব্যয় করা হয়। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই প্রতিবছর দীর্ঘস্থায়ী রোগে ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। 

দরিদ্র দেশগুলোতে অবশ্যই ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা এবং এইচআইভি/এইডসের মতো রোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তবে এর পাশাপাশি তামাক, অ্যালকোহল এবং লবণ খাওয়ার ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিহ্রাসের দিকেও মনোযোগ বাড়াতে হবে।

বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আরও ৫০ বছর লেগে যাবে। এসডিজিতে মোট ১৬৯টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতোবেশি প্রতিশ্রতি থাকার ফলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলাদাভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এই বছর আমরা এসডিজির অর্ধেক সময় পার করছি, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্ধেকের থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় কোন খাতে খরচ সবচেয়ে ফলপ্রসূ তা নির্ধারণ করতে বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করছেন। 

আমাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এসব দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিরুদ্ধে অল্প বিনোয়োগের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ সামাজিক সুবিধা লাভ করা সম্ভব। যা বেশিরভাগ দেশ নীতিগতভাবে সমর্থন করে।

ধূমপানজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে দুটি খুব কার্যকর উপায় রয়েছে। একটি হলো- উচ্চ করারোপ। অন্যটি হলো- তামাক নিয়ন্ত্রণ; যার মধ্যে পাবলিক প্লেসে বিজ্ঞাপন এবং ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত। উচ্চ করারোপের ফলে ধূমপান ব্যয়বহুল হবে। এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ধূমপান পরিহার করবে, অনেকে ধূমপপানের পরিমাণ কমিয়ে দেবে। যার ফলে কার্যত ধূমপানজনিত মৃত্যু হ্রাস পাবে। এছাড়া, এর মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আয় করবে। উচ্চ করারোপের ফলে ধূমপান কমে যাওয়ার নজির বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। 

এ সংক্রান্ত আইন পরিবর্তনের খরচ খুবই কম। নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তামাক কর চারগুণে উন্নীত করার ফলে ব্যয় হবে আনুমানিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে ধূমাপায়ীদের খরচ বাড়বে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার। এই নীতিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত খরচ হবে ৪৬২ মিলিয়ন ডলার। তবে, এই নীতির ফলে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ বাঁচবে। যার ফলে এই খাতে খরচ করা  প্রতি ডলারের বিপরীতে ১০১ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে। একইভাবে, তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য খরচ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৯২ ডলারের সামাজিক সুবিধা ভোগ করবে বিশ্ব। তামাক নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ২০২০ সালের মধ্যে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।

অ্যালকোহল সংক্রান্ত আইন সংশোধনও একটি ভালো বিনিয়োগ। নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে বার্ষিক ৩ লাখ এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে ১৬ লাখ মানুষের মৃ্ত্যুর জন্য দায়ী অ্যালকোহল। এটি অন্য রোগের প্রভাবক হিসেবেও কাজ করে। এছাড়া অ্যালকোহল সেবনের ফলে বিশ্বে আরও ৭ লাখ মানুষের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ঘটে, সেইসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সামাজিক ক্ষতি হয়। অ্যালকোহল বিধি কঠোর করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। এই খাতে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৭৬ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে। এছাড়া অ্যালোকহলের ওপর করারোপের ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে। এই খাতে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৫৩ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে।

মানবস্বাস্থ্যের জন্য আরেক বড় হুমকির নাম লবন। আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ফিনল্যান্ড এবং পোল্যান্ড প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে দিয়েছে। এটিও একটি লাভজনক বিনিয়োগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, আমাদের প্রতিদিন এক চা-চামচেরও কম লবণ খাওয়া উচিত, কিন্তু বিশ্বের প্রায় সব জায়গাতেই মানুষ অনেক বেশি লবণ গ্রহণ করে। এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকে ঝুঁকি বাড়ায়। যা প্রতিবছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ।

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে লবন নিয়ন্ত্রণের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে। তবে এর বিপরীতে বেঁচে যাবে পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণ। এই বিনিয়োগের ফলে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩৬ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে। 

এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখনই সবচেয়ে কার্যকরী বিনিয়োগের খাত বেছে নিতে হবে। এক্ষেত্রে তামাক, অ্যালকোহল ও লবন নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ একটি স্মার্ট নীতি হতে পারে।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান

-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি

-এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে

-মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা এখন অতীত?

-উন্নয়নের জন্য ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি

-দীর্ঘস্থায়ী ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় করণীয়

-সারাবিশ্বে উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি কেন নয়?