নান্দনিকতা দূষণ : দৃষ্টিকটু পোস্টারে সয়লাব ঢাকা শহর

বাসা বা ঘর সাজানোর জন্য আমরা কত কিছুই না করি। দামি পর্দা, আধুনিক আসবাবপত্র, দৃষ্টিনন্দন ইন্টেরিয়র। অনেক সময় রুমের পেইন্টিংসটা কাত হয়ে থাকলে সোজা না করা পর্যন্ত আমাদের অস্বস্তি লাগে। অন্দরমহল সাজানোর জন্য আমরা যত বেশি মনোযোগী, বাইরের পরিবশে, দেয়াল ও স্থাপনা নোংরা করার বিষয়ে আমরা ততটাই উদাসীন।

মহল্লার বাসা-বাড়ি বা অলিগলির কথা বাদই দিলাম। অফিস, আদালত, ব্যবসাকেন্দ্র, শিল্প কারখানা, শহরের প্রাণকেন্দ্রের ফুটওভার ব্রিজ , ফ্লাই ওভার, মেট্রোরেলের পিলার, সড়ক দ্বীপ, বিভাজক, সড়কের দুই ধারের দেয়াল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর, অন্যের ভাড়া নেওয়া বিলবোর্ড, দোকানের সাটার, বৃক্ষ এমনকি বিদ্যুতের খুঁটি- এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে ডিজিট্যাল ব্যনার, পোস্টার নেই। 

শহরের আনাচে-কানাচে আছে একদম নাম না জানা নেতা বা উঠতি নেতাদের নানারকম রাজনৈতিক পোস্টার। রাস্তার রেলিংও বাদ পড়েনি এই অত্যাচার থেকে। মোবাইল নম্বর প্রিন্ট করে দিয়ে ব্যবসা করছে গুটিকয়েক মানুষ।

আছে তিন চার বছর আগে শুভেচ্ছা জানানো বা দোয়া চাওয়ার ছেঁড়া- ফাটা-ঝুলন্ত পোস্টার, সিনেমার পোস্টার, কোচিং সেন্টারের পোস্টার, বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পোস্টার। পোস্টারের ওপর পোস্টার। আরও আছে কাগজের পোস্টার, খুবই দৃষ্টিকটু দেয়াল লিখন।

এই চিত্র রাজধানীর ঢাকার মতো সারাদেশেই। 

সদ্যনির্মিত একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে ঢুকলাম। অনেক মেধা, শ্রম, সময় দিয়ে বহির্বিভাগে অনেক টাকা খরচ করে পুরো দেয়াল টাইলস করা হয়েছে। কিন্তু কর্মচারী ইউনিয়নের বড় বড় নেতা (?) তাদের ভোট চেয়ে পোস্টার দিয়ে তা ঢেকে দিয়েছে। 

এখন আর টাইলস দেখতে পাবেন না, সেটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে, কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের ছবি দিয়ে। এমন শত শত উদাহরণ আছে। কোনো কোনো সরকারি অফিসে ঢুকলে বোঝাই পারবেন না এটি সরকারি অফিস নাকি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অফিস রুম।

নিজের টাকায় কেনা গাড়িতে আপনার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লোগো লাগিয়ে প্রচার চালাতে চান, পারবেন না। আপনাকে সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হবে, না নিলে পুলিশকে টাকা দিতে দিতে আপনি শেষ। 

অথচ সেই শহরে বিনা টাকায় শহরের সমস্ত দামি দামি স্থাপনায় সারাজীবনের জন্য নিজের বা দলের প্রচারের জন্য বিশাল পোস্টার সাঁটিয়ে প্রচার চালাতে পারবেন, নিজেকে বড় নেতা হিসেবে জাহির করতে পারবেন। বিনা খরচে আপনার কোম্পানির, সিনেমার ও হারবালের দৃষ্টিকটু এবং বিব্রতকর প্রচারণা চালাতে পারবেন।

পোস্টারে সৌন্দর্য হারাচ্ছে নগরী/ ফাইল ছবি/সংগৃহীত

কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন, যারা এভাবে আমাদের প্রিয় শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করছেন তাদের বাসার দেওয়ালে কোনো পোস্টার নেই। পোস্টার লাগানোর সাহসও কারও নেই।

বিমানবন্দর সড়কের দুই ধারের স্থাপনা, বিলবোর্ড, নান্দনিকতা পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। সেজন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করে সড়কের দুই পাশে বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে, নানারকম ফোয়ারা ও ভাস্কর্য দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। 

অথচ সড়কের আইল্যান্ডে একদম অপরিচিত কিছু নেতার বিশাল বড় বড় পোস্টার ল্যম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কতটা রুচিহীন জাতি হিসেবে আমরা বিদেশিদের কাছে পরিচিতি পাচ্ছি এইটা ভাববার মতো কোনো নেতা এই শহরে নেই। বিমানবন্দর সড়কে পোস্টার যদি দিতেই হয় তা সর্বোচ্চ- জাতির পিতা, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বীরশ্রেষ্ঠ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ছবি থাকতে পারে। এই দেশকে, এই মাটির সংস্কৃতিকে তুলে ধরে এমন পোস্টার বা প্রচারণা থাকতে পারে।

আইন কী বলে

দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী 

‘‘কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইবার জন্য প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা স্থান নির্ধারণ করিয়া দিতে পারিবে এবং উক্তরূপে নির্ধারিত স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে;

এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে, দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে।''

এই আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে, কোনো দেয়াল লিখন বা ক্ষেত্রমত, পোস্টার মুছিয়া ফেলা না হইলে বা অপসারণ করা না হইলে, উক্ত সময়সীমা অতিবাহিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্ব-উদ্যোগে, অননুমোদিত যে কোন দেওয়াল লিখন বা, ক্ষেত্রমত, পোস্টার মুছিয়া ফেলিতে বা অপসারণ করিতে পারিবে এবং উক্ত কার্যক্রমের আনুষঙ্গিক ব্যয়ের সমুদয় অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সুবিধাভোগীর নিকট হইতে নগদ আদায় করিবে।

কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করিয়া দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইলে উক্ত অপরাধের জন্য উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যূন ৫(পাঁচ) হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০(দশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাইবে, অনাদায়ে অনধিক ১৫(পনের) দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাহার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন বা, ক্ষেত্রমত, পোস্টার মুছিয়া ফেলিবার বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করা যাইবে।

কোনো সুবিধাভোগীর অনুকূলে ধারা এই বিধান লঙ্ঘন করিয়া দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাইলে উক্ত অপরাধের জন্য উক্ত সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে অন্যূন ১০(দশ) হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০(পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাইবে, অনাদায়ে অনধিক ৩০(ত্রিশ) দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত সুবিধাভোগীকে তাহার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন বা, ক্ষেত্রমত, পোস্টার মুছিয়া ফেলিবার বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করা যাইবে।

কর্তৃপক্ষের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই,

- মোটরসাইকেল চালকের মাথায় হেলমেট বা গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে যেভোবে সঠিকভাবে আইন কার্যকর হচ্ছে তা কেন ‘‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২'' এই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হচ্ছে না।

- সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স ছাড়া নিজের গাড়িতে নিজের কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপন দিলে পুলিশি হয়রানি বা জরিমানার শিকার হতে হয়। একই ভাবে শহরের সৌন্দর্য বিনাশ করে জনগণের সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের ভাগাড় বানানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

- ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী এনে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়। অপরাধের গুরুত্ব বুঝে ২ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং দুই থেকে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে (যদিও বাস্তব প্রয়োগ নেই), তাহলে ডিজিটাল ব্যানারের প্রধান উপকরণ পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) পলিথিনের মতো পরিবশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হওয়ার পরেও কেন কোনো আইন হচ্ছে না? যা অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই লেখায় ডিজিটাল পোস্টারের ভয়াবহ দূষণ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়নি । শুধু বলি- বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণ যেমন মানুষের ফুসফুস, পরিপাকতন্ত্র ও কানের ক্ষতি করে, ঠিক তেমনি বেপরোয়া পোস্টার সারা শহরের নান্দনিকতাকে পুরোপুরি হত্যা করেছে। সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের জন্য এটি অনেক বড় মানসিক যন্ত্রণা ও শাস্তিস্বরূপ।

এভাবে চললে এই শহরে যতই উন্নয়ন হোক, দেখতে জরাজীর্ণই লাগবে। শুধু সব ধরনের পোস্টার অপসারণ করা হোক, পোস্টার আইন যথাযত কার্যকর করা হোক, তখন এই শহরটাকে এমনিতেই ইংল্যান্ড, আমেরিকা আর সিঙ্গাপুরের মতো মনে হবে। সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়নগুলো পোস্টরের নিচে চাপা পড়ে থাকবে না।


রকিবুল হোসেন

ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট

কোয়ালিটি, হেলথ সেফটি ও পরিবেশ


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।