মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস, যমুনা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস-এগুলো কেবল ট্রেন নয়, একেকটা স্বপ্নের নাম। আমরা যারা রেলের নিয়মিত সওয়ার, ট্রেন আমাদের কাছে একটি অন্যরকম আবেগের জায়গা। সেই রেলে ধারাবাহিকভাবে নাশকতা চলছেই।
সম্প্রতি মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে তিন বছরের শিশু ইয়াসিনকে বুকে নিয়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন তার মা। সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ যে মায়ের কোল, সেখানেও ইয়াসিন বাঁচতে পারেনি। পুড়ে যাওয়া বগিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বই, ওষুধ, চশমা, স্কুলব্যাগ-হঠাৎই থমকে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আগুনের ক্ষত নিয়েই ট্রেনগুলো আবার ছুটে চলবে গন্তব্যের পথে। কিন্তু ব্যবসায়ী মিজানুরের পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন-তার সন্তান ইয়াসিন আর কখনোই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।
ট্রেন আমাদের সমৃদ্ধি আর গতিময়তার প্রতীক। সাশ্রয়ী, আরামদায়ক এবং তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে দেশের মানুষের কাছে রেল এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয়। বাংলাদেশ রেলওয়েকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে রূপকল্প ২০৪১ এবং ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে স্থল পরিবহন মাধ্যমগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ বছরে দেশে নতুন রেলপথ নির্মিত হয়েছে ৭৪০ কিলোমিটার। লোকোমোটিভ যুক্ত হয়েছে ১১১টি। যাত্রীবাহী কোচ যুক্ত হয়েছে ৫৮৮টি। বিভিন্ন রুটে নতুন ৭২৩টি ট্রেন চালু করা হয়েছে। ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ে নেটওয়ার্কের ৪৮তম জেলা হিসেবে যুক্ত হলো কক্সবাজার। ১৩৩ বছরের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় উচ্ছসিত মানুষ ফুল দিয়ে বরণ করে নিল নতুন এই রেলযাত্রাকে।
গত দেড় মাসের হরতাল অবরোধকালীন অন্তত ২৭টি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে রেলে। পাঁচটি বড় ধরনের নাশকতা ঘটেছে যাতে অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকেই। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী ১৬ নভেম্বর রাতে টাঙ্গাইল স্টেশনে টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়। ১৯ নভেম্বর রাতে জামালপুরের সরিষাবাড়ী স্টেশনে অগ্নিসংযোগ করা হয় যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনে। ২২ নভেম্বর রাতে সিলেটে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। ১৩ ডিসেম্বর রেললাইন কেটে ফেলার ফলে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনাকবলিত হয়।
এসব নাশকতায় রেলের সাতটি কোচ পুরোপুরি পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও আটটি কোচ এবং ইঞ্জিন। একেকটি পুড়ে যাওয়া কোচ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা অমূল্য সম্পদ। তার চেয়েও মূল্যবান মানুষের জীবন যার কোনো মূল্যই দুর্বৃত্তদের কাছে নেই। নাশকতা ঠেকাতে ট্রলি রান বা অ্যাডভান্স পাইলট ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ১৭০ কিলোমিটার রেলপথ পাহারায় মোতায়েন করা হয়েছে ১১১ কর্মী। গতি কমিয়ে ট্রেন চালানোর কারণে তীব্র শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্দোলন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জনগণকেই যখন নীরব দর্শক হয়ে পুড়ে মরতে হয় তখন তা আর আন্দোলন থাকে না, নাশকতায় পরিণত হয়। আন্দোলন ফলপ্রসূ হতে গেলে জনসমর্থন থাকতে হয়। নাশকতা করে, ভয় ভীতি দেখিয়ে, জানমালের ক্ষতি করে জনসমর্থন পাওয়া যায় না। নির্বাচনের আগে নাশকতার এই অপসংস্কৃতি নতুন নয়।
মানুষ একটি উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে কতিপয় দুষ্কৃতিকারীর তাণ্ডবে এই স্বপ্ন ক্রমেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। মানুষের মাঝে আতঙ্ক বাড়ছে। নাশকতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোটারদের ওপর। এমনিতেই জাতীয় অর্থনীতি চাপের মুখে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরতাল-অবরোধে দৈনিক ক্ষতি সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জর্জরিত। অক্টোবরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৯৩% হয়েছে। বিবিএস-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৫৬%, যা গত ১১ বছর ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব সহিংসতা চলমান থাকলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কম। দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
দেশে মোট শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। লাগাতার হরতাল-অবরোধে খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। এরাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশকে পৌঁছে দেন। আবার এরাই নাশকতায় পুড়ে অঙ্গার হন, পুড়ে ছাই হয় তাদের স্বপ্ন। নিহতদের পরিবারকে এই শোক বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন।
আমরা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না। আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে নয়, নিঃশঙ্ক চিত্তে বাঁচার অধিকার চাই। আমাদের এই অধিকারটুকু কি কেউ ফিরিয়ে দেবেন?
ইংরেজি বিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
ইমেইল: rahul.eng@sau.ac.bd