সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করার অধিকার আছে যেকোনো নাগরিকের। যুক্তি পাল্টা যুক্তিতে সেই মত খন্ডন করা যেতে পারে। কিন্তু সরকারের কোনো অধিকার নেই তার কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বললেই কাউকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তির ট্যাগ লাগিয়ে অবদমন করার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে বারবার তা ঘটছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার একটি যৌক্তিক দাবি। বহু বছর ধরে চলে আসা কোটাব্যবস্থায় সময়ের সাথে অবশ্যই নতুন বিন্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সংস্কারে শিক্ষার্থীদের অভিমত-কে সবার আগে গ্রাহ্য করা উচিত। কারণ, তারাই এই ব্যবস্থার মূল অংশীজন। দেশের তরুণদের একটি বিরাট অংশ বেকার। সরকারি চাকরি এখনো অনেকের কাছে প্রধান আরাধ্য। সেখানে কোটা ব্যবস্থার বৈষম্যমূলক বিন্যাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় রকমের ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।
২০১৮ সালে শিক্ষার্থীরা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে প্রথম সোচ্চার হয়। বিভিন্ন কোটায় শতকরা প্রায় ৫৬% বরাদ্দ চলে যায়। জেলা কোটা, নারী কোটা ইত্যাদি নানান কোটার সাথে মুক্তিযোদ্ধা কোটাও অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষার্থীরা এই কোটাব্যবস্থার যেসব সংস্কার দাবি করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
১. সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বর্তমান কোটা ৫৬% থেকে ১০% করা
২. কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া ৩. সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ
৪. কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না রাখাৎ
৫. চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা
এসব সংস্কার দাবি মানা হবে কি হবে না, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। কিন্তু এসব দাবি তুলে ধরার জন্য শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি বলার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করে নেই, তারা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়েছে। তারা কোটা বাদ দিতে বলে বলেনি, পুনর্বিন্যাস চেয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় প্রজন্ম কতখানি কোটা পাবে, সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে, অন্যান্য কোটায়ও কি পরিবর্তন দরকার তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ সব সময়েই খোলা থাকা উচিত। কিন্তু নানানভাবে এই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করার আন্দোলন হিসেবে প্রচার করে আন্দোলনকারীদের ট্যাগ দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে সংসদে বক্তৃতা হয়েছে, তাদের ওপর নির্মম হামলা হয়েছে, জেল জুলুমের শিকার হয়েছে তারা অনেকে। অথচ আন্দোলনকারী ওই সব শিক্ষার্থীরা আশা করেছিল, তাদের দাবি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কেউ সহমর্মিতা নিয়ে শুনবে, তাদের সাথে আলোচনা করে যৌক্তিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবে। সেই দিকে বিষয়টিকে না নিয়ে তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধী বানিয়ে অবদমন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। যাদের জন্ম স্বাধীনতার বহু বছর পরে, যারা জন্ম থেকেই স্বাধীন বাংলার আলো-হাওয়ায় মানুষ, যাদের স্বপ্ন-সাধ প্রিয় বাংলাদেশকে ঘিরে, তাদেরকে ঘৃন্য রাজাকার অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল সেই ২০১৮ সালেও। সরকারের প্রতি অভিমান ও ক্ষোভ থেকে রাজাকার শব্দের ঘৃণাকে সেদিন গায়ে মেখে নিয়েছিল অনেক শিক্ষার্থী।
সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবার এই ২০২৪ সালে। কোটা সংস্কারের বিষয়টি মীমাংসার পথে না নিয়ে, পুরনো ব্যবস্থা আবার জাগিয়ে তোলা হয়েছে আদালতে একটি রিটের মাধ্যমে। এমন একটা সময়ে এই বিষয়টি সামনে এসেছে যখন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, দৈনন্দিন জীবনের খরচ যোগাতে নাভিশ্বাস দেশের বেশিরভাগ মানুষের, এবং সরকারী কর্মকমিশনের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির খবর ভয়ানক হতাশার জন্ম দিয়েছে দেশের শিক্ষিত চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের মাঝে।
এই পটভূমিতে এবার কোটা ব্যবস্থার সংস্কারে আন্দোলেনের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। কোটা ব্যবস্থার সাথে সরকার বা সরকার প্রধানের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন সম্পর্ক দেখি না। যারা চাকরি করবে, তাদের দাবি অবশ্যই সহমর্মিতা নিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু আমরা দুঃখ ভরে লক্ষ্য করলাম, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে এ বিষয়ে কোন কথা না বলে তাদেরকে প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে। তাদের অপবাদ দেওয়া হয়েছে, অপমানজনকভাবে তাদের দাবিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে। এর পেছনে কোন যৌক্তিক কারণ দেখি না।
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটিও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলো। সে বছর ঢাকায় ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হয় এবং ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্কুলের শিশু কিশোররা রাস্তায় নামে নিরাপদ সড়কের দাবিতে। নিরাপদ সড়কের জন্য এই আন্দোলনকেও সরকার সহজভাবে নিতে পারে নি। সরকারের ভুল পদক্ষেপে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে যায় সারা দেশে। কোনো অব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করা স্বাধীনতার বিপক্ষ কিছু নয়, বরং স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এটা আমাদের অধিকার।
২০২৪ সালের বাংলাদেশ ঘিরে তরুণদের ভেতরে হতাশাবোধ কতটা প্রকট হয়েছে তা উপলব্ধি করা যায় এখনকার স্লোগানের ভাষায়।
২০১৮ বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। তখনকার সময়ে অন্যতম প্রধান শ্লোগান ছিলো- "বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।" "জয় বাংলা" স্লোগান দিয়ে তারা মিছিলে গেছে। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে স্লোগানে পরিবর্তন এসেছে। এবারের আন্দোলনে অন্যতম বড় স্লোগান "মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাষ্ট্র কারো বাপের না", "লাখো শহীদের রক্তে কেনা, রাষ্ট্র কারো বাপের না।" কতটা হতাশা আর ক্ষোভ থেকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দেশের তরুণ সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তা কী সরকারি দলটির কর্তারা ভেবে দেখেছেন? এ যেন নতুন প্রজন্ম নিজেরাই নিজেদের স্বাধীনতার সংজ্ঞা ঠিক করে নিয়েছে। কী এমন ঘটেছে এই ছয় বছরে যে স্লোগানে এতটা বড় পরিবর্তন এসেছে? বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতাকে এভাবে দেশের তরুণদের মন থেকে তুলে দেওয়ার দায় কার? তার হাতে গড়া ছাত্র সংগঠন কী করেছে যে তারা কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না বৃহত্তর ছাত্র সমাজকে তাদের দলভুক্ত করতে? কেন তাদের অবস্থান ক্রমাগত ছাত্র ছাত্র সমাজের বাইরে চলে যাচ্ছে?
এর উত্তর এখনকার বাংলাদেশের ভয়ানক চিত্রের মধ্যে আছে। দেশ পরিচালনার সকল পর্যায়ে দুর্নীতির শেকড় গভীরতর হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন, যা প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন।
সরকার সরাসরি সংকটের মোকাবিলা না করে, শিক্ষার্থীদের সাথে কোন সমঝোতা না খুঁজে, অনুগত ছাত্র সংগঠনকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার জন্য উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি বোধ হয় এই যে, এখানকার বেশিরভাগ ছাত্র সংগঠন তাদের কার্যক্রম চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, কিন্তু তারা নিদের্শনা নেয় বাইরে থেকে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা তার আরেকটি প্রমাণ দিল। ক্যাম্পাসে থেকেও তারা বুঝতে পারল না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী কী চায়, কেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে যাচ্ছে।
এবার আন্দোলনের একটা বড় দিক হলো, পরিচিত মহলে/সোস্যাল মিডিয়ায় সরকার সমর্থিত সংগঠনটির হামলাকারী সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ করা এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পোষ্ট দেওয়া। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাচ ধরে ধরে এই কাজটি করছে। একই বিষয় হয়তো শিক্ষক পর্যায়েও ছড়িয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করতে পারে নির্যাতন বিরোধী শিক্ষার্থীরা।
সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবারকার আন্দোলন। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ এই তরুণ প্রজন্মের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিলো অনেক আগেই। এবার তারা সামনে এগিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর। কারো ডাকের জন্য অপেক্ষা করছে না তারা। নিজেরাই পথ করে নিচ্ছে। কতোটা মরিয়া হলে মৃত্যুর সামনে বুকি চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় কেউ, এটা কী মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলো আবার মনে করার চেষ্টা করবেন?