কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার জেরে বন্ধ করে দেওয়া ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ডিজিটাল দ্বার। পাশাপাশি রয়েছে নতুন এক শঙ্কাও। সেটি ভিন্নমতাদর্শীদের প্রতি আক্রমণাত্মক হওয়ার শঙ্কা। এই আক্রমণটা ভার্চুয়ালি হলেও তার ভয়ভহতা ছড়িয়ে পড়তে পারে অফলাইনেও। বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে এই শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তো নেই’ই, বরং প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা।
এর আগে আমরা বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সত্য, অর্ধ-সত্যা কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বাসস্থান, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপসানালয়ে হামলার মতো ঘটনা দেখেছি। এসব ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও একেবারে কম নয়। এমনকি ফেসবুকে “হা হা রিয়্যাক্ট” কিংবা মন্তব্যের জেরে হামলা, হতাহতের মতো ঘটনাও দেখেছি আমরা। এর সবচেয়ে বড় কারণ “অসহিষ্ণুতা”। দিন দিন আমরা যেন ক্রমেই খুব বেশি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি, মুখে বাকস্বাধীনতা-মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও কারও সঙ্গে একটু দ্বিমত হলেই যেন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। সেটি অনলাইন এবং অফলাইন উভয়ক্ষেত্রেই। আর দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে এই অসহিষ্ণুতা হয়ে উঠতে পারে আরও ভয়ের।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় নিহতের সখ্যা এখন পর্যন্ত ২১১, আর সরকারি হিসেবে তা ১৫০। সংখ্যা যেটিই হোক না কেন; প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান। সহিংসতায় একটি মানুষও মারা যাবে সেটি কেউই সমর্থন করেন না। এই যে এতোগুলো মানুষের মৃত্যুর শোক এবং ক্ষোভ যে খুব সহজে ফুরিয়ে যাবে তা নয়। এর সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য আহত মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের ক্ষোভ। এই সব ক্ষোভ যে অনেক মানুষ ফেসবুকে ঢেলে দেবেন, সেটি সহজে অনুমেয়। আর সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দিতে একটি পক্ষ যে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেবে তা পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করাই যায়। আর এতেই রয়েছে শঙ্কা; ভিন্নমতের বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মীর প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার শঙ্কা। মনোবিদদের ভাষ্যে, মানুষ যখন কোনো শোক কিংবা ক্ষুব্ধ মানসিকতার মধ্যে থাকেন; তখন তার বাছবিচার করার ক্ষমতা লোপ পায়, তার আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। আর দেশের এই সাম্প্রতিক সহিংসতায় বিভিন্ন মানুষের মৃত্যুর ঘটনার বিষাদ ছুঁয়ে গেছে তাদের স্বজন নন এমন অনেক মানুষকেও। তারা ইতোমধ্যে অনলাইন-অফলাইনে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আর সাধারণ মানুষের এই আবেগের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ যে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করবে না, তা বলা যায় না।
শোক ও ক্ষোভপ্রকাশ খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতা যেন অন্যের স্বাধীনতার জন্য হুমকি না হয়ে ওঠে, সেটি যেন আর কোনো সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটায় সেই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়; প্রতিটি ব্যক্তিরও।
ফেসবুক সরকারিভাবে আজ থেকে চালু হলেও অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে আগে থেকেই ফেসবুক ব্যবহার করছেন। সেখানে দেখা গেছে, আগের যেকোনো ইস্যুর মতোই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংস পরিস্থিতি নিয়েও নেটিজেনরা দুইভাগে বিভক্ত। কেউ যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, অমনি তাকে “হত্যাকারীর পক্ষাবলম্বনের” ট্যাগ দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। কেউ যদি প্রোফাইল কালো করছেন, তো প্রোফাইল লালকারী তাকে আক্রমণ করছেন। একইভাবে লাল আক্রমণ করছে কালোকে। আর এটিই হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। ঠেলে দিতে পারে নতুন কোনো সহিংসতার দিকে। যে প্রাণ ঝরে গেছে তার ক্ষতি পূরণ হবে না, কিন্তু একটু দায়িত্ববান হলেই ঠেকানো যাবে নতুন কোনো সহিংসতা। আর তাই দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকে-আমাকে সবাইকে। সতর্ক থাকতে হবে সুযোগ সন্ধানীদেরও বিষয়েও। আপনার আবেগ এবং ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন নতুন কোনো সহিংসতার উসকানি না দিতে পারে সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। নিজে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। আবার যে সত্য শেয়ার করলে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য প্রভাবিত হতে পারে; পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন কিছু কিছু বিষয় শেয়ার করা থেকেও বিরত রাখতে হবে নিজেকে।
সর্বোপরি, ব্যক্তি, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবার কাছ থেকে দায়িত্বশীল ও সহিষ্ণু আচরণের প্রত্যাশা। মানুষের মুক্তি আসুক। সু-শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। বিচার হোক প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের; বিচার হোক রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি সাধনকারীদের। শাস্তি হোক গুজব প্রচারকারী ও উসকানিদাতাদের।