বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী প্রধানের হাতে। তিনি বলেছেন দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য গঠন করা হবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশের আপামর জনতার দৃষ্টি, নতুন এই সরকারের বাকি সদস্যদের দিকে। আমি আশা করব এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যাদের সঙ্গে পরোক্ষ কিংবা প্রতক্ষ্যভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক আছে এমন ব্যক্তিদের না রাখা।
বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একজন সুইডিশ রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আজ কিছু বলতে চাই। দীর্ঘ দিন থেকে সুইডেনের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে এখন বার বার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিটা আসলে কোন পর্যায়ে পড়ে? এ ধরনের রাজনৈতিক ধারা আর কোনো দেশে আছে কি-না আমার জানা নেই!
বাংলাদেশে বার বার কেন আসে হত্যা আর অভ্যুত্থান? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একে একে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছেন হয় তাদের কাউকে করা হয়েছে হত্যা নতুবা তারা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হারিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। কিন্তু কেন?
রাজনীতিতে গণতন্ত্র অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদৌ কি কোনো গণতন্ত্র আছে? এখানে আছে শুধু তোষামোদী, চাটুকারিতা, একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র। এখানে নিজ নিজ দলে গণতন্ত্রিক প্রথা চালু না করে শুধু গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিত্কৎর করা হয়। বড় বড় রাজনৈতিক দল বিরোধী অবস্থানে থাকলে সরকারকে বলে স্বৈরাচার আবার ক্ষমতায় গেলে তখন তারা নিজেরাই হয়ে যায় স্বৈরাচার।
এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এ ধরনের রাজনীতির পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই পন্থার পরিবর্তন আনার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ বা আগ্রহ দেখায়নি।
আজকের তরুণ ও ছাত্রসমাজ যারা সম্প্রতি হয়ে যাওয়া অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন একমাত্র তারাই পারবেন বাংলাদেশকে পরিবারতন্ত্র একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্ত করে একটি বাস্তব গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। এজন্য যারা আগামীতে জাতীয় সরকারে ক্ষমতায় আসছেন তাদের এই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন ব্রাঞ্চের স্বীকৃতির বিষয়টি আমার কাছে অনেকটা হাস্যকর বলে মনে হয়। দলে গণতন্ত্র থাকলে জেলা উপজেলা এমনকি এলাকা পর্যায়ের কমিটিগুলোর কোনো স্বীকৃতির প্রশ্ন আসে না। দলে বিভক্ততা আসে না। নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির সম্ভবনাও কম। দলীয় কর্মীদের সরাসরি সমর্থনে নির্বাচিত হবে নেতৃত্ব। তাহলে কর্মীদের খুব সহজেই দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকে।
তা না করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা নেত্রিরা ক্ষমতাকে অগণতান্ত্রিকভাবে কেন্দ্রের হাতে আকড়িয়ে ধরে রেখেছে। সৃষ্টি করা হয়েছে স্বীকৃতি নামের ক্ষমতা ও আর দুর্নীতির খেলা। কেন্দ্রের এই নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক খেলার কারণেই মূলত সৃষ্টি হচ্ছে একই দলে একের অধিক কমিটি, ও নেতৃত্ব। কখনো কখনো আবার দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে হয় দলাদলি মারামারি আর খুনাখুনি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্লাটফর্মে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে আসার কোনো সুযোগ সাধারণ সদস্যদের নেই। দলগুলো চলছে নেতা ও পরিবারতন্ত্র কেন্দ্রিক। দলে গণতন্ত্র থাকলে নেতা নেত্রীদের কর্মীদের কাছে জবাবদিহিতার দ্বার উন্মুক্ত হয়। অন্যদিকে দল একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর না হয়ে দল হয় কর্মী নির্ভর।
ফলে কর্মীরা প্রকাশ্যে নেতা নেত্রীদের সাংগঠনিক কাজ কর্মের সমালোচনা করার সুযোগ পায়। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা তখন নিজেদের ভুল শুদ্ধ করার সুযোগ পাবে। রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বেবস্থা কার্যকরী করা হলে তখন আর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে স্বীকৃতির প্রয়োজন হবে না। দলের গঠনতন্ত্র মেনে নিয়ম অনুসারে সন্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।
ইউরোপিয়ান গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে তুলনা করে বলা যেতে পারে এখানে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয় সরাসরি সদস্যদের ভোটে কোনো একক কেন্দ্রীয় নেতা বা নেত্রির নির্দেশে নয়। ফলে জেলা কমিটি কিংবা কোনো কেন্দ্রীয় নেতার স্বীকৃতির প্রয়োজন থাকবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের গণতান্ত্রিক সিস্টেম চালু করা হলে কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষমতার প্রভাব আর অন্যান্য কমিটি নির্বাচনে থাকবে না।
তাহলে দলের অন্যান্য নেতা নেত্রীরা কোথায় কোথায় মিডিয়াতে আর বলবেন না, দলীয় প্রধান সকল সিদ্ধান্তের মালিক। গণতান্ত্রিক সিস্টেমে দলীয় প্রধান কখনো সকল সিদ্ধান্তের মালিক হতে পারেন না। চাইলে তিনি শুধু কেন্দ্রিয় কমিটির সিদ্ধান্ত মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পারেন।
গণতান্ত্রিক ভাষায় “আমি” বলে কোনো শব্দ নেই। বলতে হয় “আমরা”। দলের সিদ্ধান্তের মালিক তো হবে কর্মী, নেতারা নয়। একেই বলে “গণতন্ত্র”।
বাংলাদেশের বর্তমান বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেখানে কি করুণ অবস্থা। ঢাক ঢল পিটিয়ে করা হয় কাউন্সিল অধিবেশন। জানিনা দলের গঠনতন্ত্রে এধরনের কাউন্সিল অধিবেশন করার কোনো নিয়ম আছে কি-না। দলের সভার পেছনে আগে থেকেই প্রকাশ পায় পরিবারতন্ত্রের ছবি। এ সকল দলে এমন কেউ কি আছেন যিনি প্রকাশ্যে একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার? না, কারো সেই সৎ সাহস নেই। কারণ কেউ রাজনীতি থেকে আর ছিটকে পড়তে চান না।
সুতরাং দলীয় প্রধান যা বলবেন সেটাই হলো দলের গঠনতন্ত্র, গণতন্ত্র ও আদর্শ। তিনি কখনোই ভুল করতে পারেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে কোনো নেতা কখনো নির্বাচিত হয় না, হয় নিযুক্ত। এই রাজনীতিকে পুঁজি করেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যুগ যুগ ধরে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের একক নেতৃত্ব।
এখানে চলছে গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক পথে পরিবারতন্ত্র ও একক নেতৃত্ব। ফলে তৃণমূলে আদর্শবান, সৎ ও পরীক্ষিত নেতারা নেতৃত্বে আসতে পারে না। অপরদিকে দীর্ঘ সময় দলীয় প্রধানের পরিবর্তন হয় না।
দলে প্রকৃত গণতন্ত্র না থাকায় বাংলাদেশে শক্ত হয়ে বসে আছে একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র। শুধু পরিবার থেকে আসছে বলেই তাকে উড়ে এসে জুড়ে বসতে হবে এমন কোনো কথা নয়। আসতে হবে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠিতে। শুধুমাত্র পারিবারিক কারণে নয়।
দলে গণতন্ত্র আসলে এই নিয়মের পরিবর্তন খুব সহজেই চলে আসতে বাধ্য। আশেপাশে অনেক দেশেই পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি একের পর এক এখন শেষ হওয়ার পথে। সুতরাং পরিবারতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দলে গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে চালু করার ওপর জোর দিতে হবে। তাহলে দলীয় কর্মীদের দ্বারা খুব সহজেই দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দলে গণতন্ত্র ফিরে এলে এমনিতেই একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্রের অবসান হবে। আর তা না হলে এভাবেই বাংলাদেশের মানুষকে একের পর এক সরকার পরিবর্তন নির্বাচনের মাধ্যমে না হয়ে গণঅভ্যুত্থান কিংবা হত্যার মধ্য দিয়ে করতে হবে।