শৈশব থেকে বড় হতে হতে মানুষ তার দৈনন্দিন চাহিদা সম্পর্কে তার আশেপাশের পরিবেশ থেকে শেখে। আর উচিত-অনুচিতের বিষয়ে সচেতন হয় তার বাবা-মা, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের কাছ থেকে। আবার সময়ের সাথে সাথে পাঠ্যপুস্তক, সামাজিক রীতি-নীতি এবং আইনগুলি পরিবর্তিত হয়; একইভাবে সেসব পরিবর্তন গ্রহণ করার বিষয়েও মতপার্থ্যপক্য থাকে। তবে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন সংজ্ঞা এত সহজে পরিবর্তিত হয় না।
ধর্মগ্রন্থগুলিতেও মানুষকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে নানান উপদেশ ও বিধি-নিষেধ আছে, যেসব অনুসরণ করলে একটি জাতির কল্যাণ অবশ্যম্ভাবী।
তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত দেশগুলোতে বেশি জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ড হাতে নেয়া হয় এবং সেসব দেশে জবাবদিহিতাও বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে সরকারের নীতিনির্ধারক, আমলা এবং সুশীল সমাজের নেতারা তাদের মানসিকতা এবং অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আমরা একটি উদার, সুশৃংখল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠন করতে পারিনি। এই দুর্বলতার পেছনের কিছু মূল কারণ হল মানসম্মত শিক্ষার অভাব, দৈনন্দিন জীবনে নীতি-নৈতিকতা অনুসরণে অনীহা, এবং অপরাধ ও দুর্নীতিকে দায়মুক্তির সাথে উৎসাহিত করা।
এর বিপরীতে আমরা দেখেছি, বছরের পর বছর ধরে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মহল থেকে সৎ পরামর্শ দেওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক সরকারগুলো জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠনের লক্ষ্যে তাদের একগুঁয়েমি ও অহংকার বজায় রেখে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে একতরফাভাবে দেশ শাসন করেছে। এতদসত্ত্বেও সরকারগুলি যতটুকু জনবান্ধব কাজ হাতে নেয়, সেটা শুধুমাত্র সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারনে ও নির্বাচনমুখী কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে নিতে দেখা যায়।
বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা ৫ আগস্ট সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে ২১ দিনের এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করে, যা কোন বিরোধী দল বা জোট অথবা সুশীল সমাজ ১৫ বছরেও পারেনি। তাই এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের পর অপরাধীদের বিচার করা, জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের দায়িত্বও তাদের উপরই বর্তায়।
তাদের দ্বারা ইতোমধ্যে গঠিত ২১ জনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিন এবং আগের সরকার পতনের পর থেকে দুই সপ্তাহ পেরিয়েছে। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, একটি বিপ্লবী সরকার নিজস্ব ধারায় গঠিত না হয়ে বরং অতীতের সংবিধান ও অন্যান্য আইনি কাঠামোর মধ্যে শপথ নিলো। এতে করে বুঝা যায় যে, দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতেই শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সরকার সকল প্রচলিত নিয়ম মেনেই রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
কিন্তু নেতৃত্বের সংকট এবং প্রথম কয়েকদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ সারাদেশজুড়ে সাবেক সরকারের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের উপর সহিংস হামলা চালায় এবং বিভিন্ন স্থাপনায় বিনা বাধায় লুটপাট-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগিতায় বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিগ্রস্ত ও সাবেক সরকারের মদদপুষ্ট ব্যক্তিদের সরানোর দাবিতে আওয়াজ তুলছে। এসবের মধ্যে আইনের বরখেলাপ করে প্রকাশ্যে অমানবিক পন্থায় হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে যা দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ ও বিপ্লবী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
এমতাবস্থায়, প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসনের কারনে মানুষের মাঝে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, এসব হামলায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে। এই যুক্তিটি সত্যি হলেও সার্বজনীন আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এবং বিপ্লবী সরকারের নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির সাথে এ ধরণের প্রতিহিংসামূলক হত্যা-হামলা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জুলাই-আগস্টের বিপ্লবে নিহত-আহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধের জন্য দায়ী সকল ব্যক্তিদের বিচার করতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে আইনের যথাযথ সংশোধন করা এবং অতীতের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো পরবর্তী সরকার আসলে রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা নানা অন্যায় ও অমানবিক ঘটনা আবারও সংঘটিত হতে পারে, যা শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ এবং বিপ্লবী সরকারের নিরলস প্রচেষ্টাকে ম্লান করতে পারে।
গণবিপ্লবের সাথে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত জনগণ রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তারা চায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত হোক। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের কারনে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা পচে গেছে। নয়তো এই উন্নয়ন আরও স্থায়ীত্বশীল হতো এবং মানুষের মানবিক উন্নয়নও চোখে পড়তো।
এই পচা দেশটিকে একটি সুশৃঙ্খল দেশে পরিণত করা কোনো সহজ কাজ নয়, আবার অসম্ভবও নয়। কেননা, এই বিপ্লবী সরকারের প্রতি শিক্ষার্থী ছাড়াও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন আছে। আর তাই উপদেষ্টাসহ শিক্ষার্থীদের নেতৃবৃন্দকে শান্ত থাকতে হবে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে এমন উপাদানগুলোকে সংশোধনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।