স্বৈরাচার উৎখাতে জয়ী ছাত্র-জনতার প্রতি খোলা চিঠি

কবিগুরুসহ বিভিন্ন কবিরা অনেক আগেই ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন, যে তরুণরাই এই দেশের প্রাণ এবং পথ প্রদর্শক। কবিগুরু লিখেছেন, "ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।”

কবি মঈনুদ্দীন লিখেছেন, “খোকা খুকু লড়বে ভালোদেশ গড়বে।”

আবু সাঈদ বুঝি নজরুলের লেখা সেই বীর, “বল বীর, বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”

পুলিশের গুলিতেও দাঁড়িয়ে থাকে হিমাদ্রির শিখরের মতো। তার দাড়িয়ে থাকার দৃপ্ত ভঙ্গির ছবি শ্রেষ্ঠ  পুরস্কার না পেলেও যুগ যুগ ধরে প্রেরণা যোগাবে বিপ্লবীদের। শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এই বীরগাঁথা। মুগ্ধের “পানি লাগবে পানি?” হাজার বছর ধরে কানে বাজবে, এক বিপ্লবী কবিতার মতো। পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া ইয়ামিনের এক ফোঁটা পানির জন্য খাবি খাওয়া কেউ ভুলতে পারবে না। আরও অনেক হাজার প্রাণ ঝরে গেছে ক্যামেরার বাইরে, যাদের কাহিনী, আর্ত চিৎকার, পানি ও বাতাসের জন্য খাবি খাওয়া আমরা দেখতে পাইনি। তবে তোমরা জেনে রেখো, তোমাদের আত্মত্যাগ কেউ কখনো ভুলবে না, বৃথা যাবে না। অনেক অপরিচিত যুবক পুলিশকে বলছে, সাহস থাকলে মারো গুলি। কী অকুতোভয় এই যৌবন! যে তরুণী শেখ হাসিনা কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, যে চার কোটি হাত যদি কলম ছেড়ে অস্ত্র তুলে নেয়, তখন তিনি কোথায় যাবেন? সেই তরুণীকে জানাই সালাম। তোমাকে চিনিনা জানি না তবে তোমার ডাকে সারা বাংলাদেশের মানুষ যে ঝাঁপিয়ে পড়বে এই নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। তুমি যে বাংলা মায়ের আদি চিরন্তন এক রুপ।

নাহিদ, আসিফ, সারজিল ও হাজারো তরুণ-তরুণীদের জন্য রইলো দোয়া ও শুভাশীষ। তোমরা পথভ্রস্ট হয়োনা। সাফল্য আসবেই। তবুও আমার কেনো জানি ভয় হয়, আমাদের নিস্পাপ এই তরুণরা বিত্ত, বৈভবের হাতছানিতে তাদের শপথ থেকে না বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তোমাদের হতে হবে গৌতম বুদ্ধের মতো অবিচল, বুদ্ধত্ব লাভের শেষ মুহূর্তে মারের কন্যাদের উদ্বাহু উত্তাল নৃত্য তাকে তার ধ্যান থেকে নাড়াতে পারেনি। তেমনি তোমরাও অবিচল থেকো। মন্ত্রণালয়ের ঠাণ্ডা ঘর, চাটুকারদের নিত্য মিষ্টি কথা, টাকা পয়সার ঝনঝনানি কোনোভাবেই যাতে তোমাদের বিচলিত না করে। তোমাদের নাম লেখা রবে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ে। আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে স্বৈরাচার ও তার সহকর্মীরা। বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তন আনার এইতো সময়। কোনোদিন যাতে এই দেশে কোনো স্বৈরাচার বা তাদের চাটুকাররা স্থান না পায়।

শোনা যায়, শেখ মুজিবকে ফিডেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, “মুজিব, দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে চালাও, তাদের অভিজ্ঞতা নেই বটে, কিন্তু তাদের দেশ প্রেমের অভাব নেই।” মুজিব শোনেননি সেই উপদেশ। পাকিস্তান ফেরত ও অভিজ্ঞ চাটুকারদের নিয়ে শাসন করতে চেয়েছিলেন এই দেশ। তার পরিণাম আমরা দেখেছি। তোমাদের অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু রয়েছে অবিরল দেশ প্রম, দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসা, কী দরকার অভিজ্ঞতার? তোমরা শাসক হবে না, তোমরা মানুষের সেবক হবে। তোমরা, ওবায়দুল কাদের, দিপুমনি, আসাদুজ্জামান কামাল, পলক হবে না। তোমরা হবে নাহিদ, তোমরা হবে আসিফ, তোমরা হবে সারজিস।

আমাদের নেতারা গণতন্ত্রের নামে যে ভজগটতন্ত্র চালু করেছেন তার খোলনলচে যদি তোমরা বদল না কর, তাহলে যা ছিল তাই থাকবে; “থোর বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোর”।

আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়েছি, ক্ষমতার বিভেদকরণ (Separation of Power)। রাষ্ট্র ক্ষমতার তিনটি অঙ্গ যতই স্বাধীন ও স্বকীয় হবে, গণতন্ত্র ততই মজবুত হবে। Legislature (আইন সভা), Judiciary (বিচার বিভাগ) and Executive (শাসন ব্যবস্থা)। আমাদের দেশে আইন সভার সদস্য বা এমপিরা যেন দেশের হর্তাকর্তা, তাদের আদেশ ছাড়া তার এলাকার কোনো পাতাও নড়ে না। অথচ তিনি আইন সভার একজন সদস্য যার কাজ লাগসই এবং যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা, দেশ শাসন করা নয়। জেলা প্রসাশক, পুলিশ, প্রতিটি স্কুল ও কলেজের বোর্ডের পরিচালনা তার হুকুম ছাড়া চলেনা। পুলিশের একজন আইজিপি বলেছিলেন যে এক থানার ওসি তার আদেশ মানেন না। তিনি স্থানীয় এম পির আদেশ ছাড়া এক পা নড়েন না।

আমাদের দেশের কিছু মানুষের স্বপ্ন হলো, কোনোভাবে এমপি হয়ে গেলেই টাকা বানিয়ে বিদেশে পাচার করে দেবে। একসময় সেখানে গিয়ে বসবাস করবে। এই মরার দেশ তো শুধু টাকা বানানোর কল! তাই দেখো তাদের বাড়িতে বস্তা বস্তা টাকা, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত দের কাছেও। কিন্তু আমরা যারা দেশ ছেড়ে যেতে চাই না, তাদের কী হবে? ৮৫ টাকার ডলার ৩ মাসে ১২৫ টাকায় অবমুল্যায়ন হয়। আমরা উপোস থাকি।

এইরকম ভজগটতন্ত্র দিয়ে আমাদের কী হবে? তাই প্রথমেই এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। একজন এমপি যাতে কোনোভাবেই বিচার বিভাগ ও শাসন ব্যবস্থায় নাক না গলাতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। তারা বিচার বিভাগকে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন যাতে কখনো তাদের বিচার না করা যায়। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন হয় তাহলে তো তাদের বিপদ।

এছাড়াও রাজস্ব বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবং সব ধরনের সাংবিধানিক সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। তাই এই স্বৈরাচারীতা। তারাই স্বৈরাচার কে বৈধতা দেয়। প্রয়োজনে সংবিধান এর সংশোধন করতে হবে।

মার্কিন একজন সিনেটর কি তার নিজের অঙ্গরাজ্যে বিচার বা শাসন ব্যবস্থায় কোনোরকম হস্তখেপ করতে পারেন?

আমাদের এক শ্রীলঙ্কান বন্ধু লিখেছেন, তাদের মতো ভুল যাতে আমরা না করি। তারাও আমাদের মত পার্লামেন্ট এর বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছিলেন, এখন ২ বছর পর সেই পুরানো মুখগুলোর জন্য ভোট হচ্ছে। তিনি বলছেন, তাদের ভুল থেকে আমরা যাতে শিক্ষা গ্রহণ করি। আমাদের অবস্থা যাতে তাদের মতো না হয়, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে।

সব কিছু বলতে গেলে লেখাটি অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। আমি আশা করি, আমার বক্তব্য তোমরা বুঝতে পেরেছো। এই জন্য যতো সময় দরকার তাই নিতে হবে, আমাদের জনগণকেও এই সময় দিতে হবে। তবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এখনই আদা-জল খেয়ে কাজে লেগে যেতে হবে। জয় আমাদের হবেই। দেশের মানুষ চেয়ে আছে তোমাদের দিকে।

কুড়িগ্রামের সেই মায়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, “আমার ছোলটা চাকরি চাইবার গেছিনু, চাকুরি নাই বা দিনু, কিন্তু মারলি কেনে?”

তুষার কান্তি চাকমা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়