সবার মতো জুলাই-আগস্ট পুরোটা সময় দেশ নিয়ে অস্থিরতা আর উদ্বেগ থেকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজখবর রাখবার চেষ্টা করেছি। খবর নিতে যেয়ে যেসব তথ্য উপাত্ত পেয়েছি তা বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে! নিরাশায়, রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে, হতাশায় কখনো কুকড়ে পড়ছি। দুই চোখে সিস্টেমেটিক দুর্নীতির যে হিসাব তা দেখেই যে কেবল কষ্ট পাচ্ছি তা নয়। কষ্ট পাচ্ছি যখন দেখছি ছাত্রজনতার হাত ধরে নতুন বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা তাকে খাটো করে বর্তমান বাস্তবতা আর গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা নজিরবিহীন নানান অনিয়ম আর কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যাবস্থাকে এখনো এক চোখে, একপেষে দৃষ্টিতে দেখছেন কিছু মানুষ।
আর্থিক লুটপাটের ক্ষয়ক্ষতি এ দেশের মানুষ হয়তো সামনে পুষিয়ে নেবে কিন্তু সুশাসন আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যাকে ধ্বংস করা হয়েছে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে সেই ক্ষতির পরিমাপ হবে কীভাবে জানি না। স্বৈরতন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়ে যে পুরো সমাজ ব্যবস্থার ধ্বংস, যে নৈতিক অবক্ষয় তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়ত একটা বড় সময় লাগবে এই জাতির। অন্তত গত দুমাসে আমাদের তথাকথিত সুশীলসমাজ, শিল্পী সমাজ বা বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বা তাদের অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় কষ্ট পেয়েছেন অনেকেই। তারা আমাদের এই নতুন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ” বলে যারা নানান সময়ে আওয়াজ তুলতেন, কোথায় ছিল তাদের দেশপ্রেম যখন ১৫ বছরের নৈরাজ্য ও অনিয়মের জালে ধ্বংস হয়েছে সমাজ ব্যবস্থা? দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাক্তি স্বার্থের চেতনায় এ নৈরাজ্যকে বাহবা দিয়ে যায়নি...বরঞ্চ এইসব সুশীলরাই ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারের পাশে থেকেছেন, পা চেটেছেন।
একজন বুদ্ধিজীবীকে জুলাইয়ের শেষে জিজ্ঞেস করছিলাম, দেশের নৈরাজ্য ও অপশাসনের জন্যে কে দায়ী? তিনি বারবারই বললেন, “আমরা সবাই দায়ী”। সুশীলরা সবাইকে দায়ী করে আসলে কাকে বা কাদের রক্ষা করতে চান তা মানুষ বোধকরি আজ বোঝে। তিনি আরও বলেছিলেন, “সবার নিশ্চুপ থাকাই এইসব নৈরাজ্যের মূল কারণ”। জানতে ইচ্ছে হয়, কোন চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নির্লজ্জভাবে স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগ সরকারের অনুরাগী ছিলেন সেইসব উদারপন্থী সুশীলরা? তারা তো একেবারে নিশ্চুপ ছিলেন না। তারা কেবল বিগত সরকারের গুনগান গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তুলতেন। সাধারণ মানুষ কিংবা কিছু বিদেশি গণমাধ্যম যখন সরকারের নানান অনিয়মের ঘটনা তুলে ধরেছেন তারা তখন “বিকল্প কে?” এমন বুলি তুলে স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগ সরকারকে আরও বেশি লুটতরাজ করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছেন। তারা স্বৈরাচারের পাশে থেকে আসলে নিজেরাও এক একজন ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছেন।
এমন ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষ থেকে যখন সাধারণ ছাত্রদের ওপর আক্রমণ এলো জুলাই মাসে, যখন গুলি চললো ছাত্রদের ওপর তখন আহত হয়েছে সমগ্র দেশ, বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশের সাধারণ মানুষ। নানান ধরণের শিক্ষা ব্যাবস্থার ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা ছাত্ররা, সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, সবাই যখন এক হলো তখনই অবিশ্বাস্য অল্প সময়ের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন লেলিহান গণ-আন্দোলনে পর্যবসিত হলো। জুলাইয়ের এই আন্দোলন তার চরম রূপ পেলো তখন, যখন সাঈদ টান টান বুকে দাঁড়ালো রাজপথে আর তাকে গুলি করে হত্যা করলো স্বৈরাচারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী। একসময় কারফিউ এর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বের হয়ে এলো রাস্তায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। রাজপথের বিক্ষোভ একসময় সর্বজনীন হয়ে উঠলো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষ এক হয়ে গেলো। আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের বলতে শুনলাম , "পেছনে পুলিশ আর সামনে স্বাধীনতা - তাই আমরা হাঁটছি সামনে।" দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে ছিল এই ঘটনার পর নিশ্চিত জেনেছে যে পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো পথ আর বাংলাদেশের সামনে অবশিষ্ট নেই। সাঈদের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে মানুষ নিজের সন্তানকে দেখলো, নিজেদের অপমানকে দেখল—দেখল তাদের নিজেদের অস্তিত্বের ওপর নৃশংস এক আক্রমণ। ফলে আন্দোলন এমন প্রবল হয়ে উঠল যে তার স্রোতে স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে হলো প্রতিবেশী ভারতে।
সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবলই সরকারের তাঁবেদারি করেছে, তাদের প্রতি মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়েছে। এই সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের লেখায়-কাজে ফল হয়েছে হিতে-বিপরীত। তারা যা ভালো বলেছেন জনসাধারণ নিশ্চিত জেনেছে যে, তা মন্দ না হয়ে যায় না। তারা যার পক্ষে থেকেছেন জনসাধারণ তার বিপক্ষে গেছে। মানুষ জেনে ফেললো, সেইসব গণমাধ্যম বা সাংবাদিকরা তাদের স্বার্থের শত্রু, নিরপেক্ষ নন। তাদের উদ্দেশ্য স্বৈরাচারী শোষণব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখা। এভাবে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন সেইসব সাংবাদিকরা পরোক্ষভাবে ছাত্রজনতার উপকারই করেছেন। মানুষের দৃষ্টি খুলে দিতে তারাও সাহায্য করেছেন, এই করে জনতার আন্দোলনকে তারাও এগিয়ে দিয়েছেন।
এবারের ছাত্রজনতার আন্দোলনের পেছনে কেমন বা কোনো দার্শনিক প্রস্তুতি ছিল কি-না তা পরিষ্কার নয়। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের গুটিকয়েকজন বাদে, এই আন্দোলনে ছিলেন না। আন্দোলন যখন এগিয়ে গেছে তখন তারা এর সক্ষমতা বা গতি সম্পর্কে একেবারেই কোনো ধারণা করতে পারেননি। বুদ্ধিজীবীরা কেবল স্বৈরাচারী সরকারের মহিমা প্রচার করেছেন, যাতে শোষণ কাজটা সহজ হয়। সরকারের বিভিন্ন সময়ে যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের পক্ষে সরকারি কাজের সমর্থন না করে উপায় থাকেনি, যা এখনো অব্যাহত আছে। অদ্ভুত এক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল দেশে। ভয়টা মোটেই কল্পিত ভয় ছিল না। বিরোধী মত বলে পরিচিত যারা, তাদের গুম, খুন কিংবা কারাগারে নিক্ষেপ করার ব্যাপারে সরকার দ্বিধা করেনি। মুক্তবুদ্ধি চর্চা, অবাধে চিন্তা ও মতামত প্রকাশ করার সুযোগ একেবারেই ধ্বংস করা হয়েছিল।
আমাদের সন্তানদের হাত ধরেই আজ নতুন এক বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। এই প্রজন্মই আমাদের অন্ধকার থেকে তুলে আলোর পথ দেখালো। এখন এই আলোর পথে কতদূর হাঁটবো আমরা তার অনেকটাই নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগে। আমরা এই দীর্ঘ পথে হাটতে যদি ক্লান্ত হয়ে যাই, আমাদের সন্তানদের অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। আমাদের বর্তমান তথাকথিত সুশীলদের মতো আমাদের সন্তানরা যেন এমন “দেশপ্রেমিক” হয়ে বেড়ে না ওঠে যাদের কাছে দেশ নয় নিজের স্বার্থই বড়!