অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে

আমাদের নাগরিক অধিকার কার্যত বিলুপ্ত ছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট পর্যন্ত। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত পোষণের স্বাধীনতা কোনো কিছুই ছিল না। এমনকি কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার কারণে দলের ভেতরে গণতন্ত্রের নূন্যতম চর্চাও ছিল না। প্রশংসা ও প্রশস্তির রাজনৈতিক সংস্কৃতির আবর্তে পড়ে সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসহ সিভিল সোসাইটির বিনাশ ঘটেছে। একদল বিবেকহীন বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সিভিল সার্ভেন্ট নির্লজ্জভাবে স্বৈরাচারকে বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন দিয়ে চলেছিলেন।

অবশেষে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভুত্থানের পর প্রায় ১,৪২৩ জন শহিদের আত্মাহুতির মাধ্যমে সুদীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে ৫ জুলাই ২০২৪। বিপ্লব শেষে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত, সামাজিকভাবে বিতর্কিত ও সাংস্কৃতিকভাবে বিকৃত একটি রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ডান-বাম নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের নিঃশর্ত সমর্থন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে। আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি ড. ইউনূস। আন্তর্জাতিকভাবে সবাই তাকে স্বাগত জানায় এবং বাংলাদেশের পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। কিন্তু এমন ঐতিহাসিক বিজয়ের পর এখনো স্বৈরশাসকের প্রেতাত্মারা আধিপত্যবাদের আক্রোশ নিয়ে নানানভাবে এই সরকারকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী রুচিহীনভাবে ট্রল করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হয়রানিমূলক ট্রল থেকে মুক্ত থাকতে পারছেন না ড. আসিফ নজরুল। কনিষ্ঠ দুজন উপদেষ্টাদের নিয়েও নানান বাজে কথা বলা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে। সংস্কার ও নির্বাচনের গুরু দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ শুরু করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই সুতরং এই সরকারের সফলতা, সার্থকতা ও সুনাম-সুখ্যাতি ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, জাতীয় ঐকমত্য ও জনগণের সমর্থনের ওপরই নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যই মূলত জাতীয় ঐকমত্য। অধিকাংশ বিষয়কে আমলে নিয়ে বহুসংখক মানুষকে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়গুলোতে একমতে হতে হবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে শাক্তিশালী একটি অবস্থানে দাঁড় করাতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। 

জাতির এমন ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক দলগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা খুবই জরুরি।  আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানান পর্যায়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার ইতিহাস আমাদের জানা আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্নিহিত ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ক্ষুদ্র স্বার্থ আর নেতিবাচক কার্যক্রম জনসাধারণকে বিভক্ত করেছে, বিচলিত করেছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ শক্তি প্রয়োগ করে জনগণের ভোটাধিকারকে পদদলিত করেছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে, দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনবাবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থায়ী রাজনৈতিক সঙ্কট এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। 

প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সহযোগিতা বিশেভাবে প্রয়োজন। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে স্বৈরশাসনের বিপক্ষে সব বিরোধী দল ও গোষ্ঠী ছিল একাট্টা। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকারের পতনের পর এখন রাজনৈতিক দলের ভেতর  নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মুহূর্তে খানিকটা জাতীয় ঐকমত্যের সঙ্কট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনের আগে নিজ নিজ নির্বাচনী ঘোষণা দিয়ে  জনগণকে পাশে টানবেন এটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। কিন্তু আমাদের এমন ক্রান্তিকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুটো কাজ-সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়াও জাতীয় আদর্শ নির্ধারণ ও মৌলিক কিছু বিষয়ে সব ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের একমত হওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরী হয়েছে এই সময়ে। এই সময়কে আমরা, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ধারণ করতে ব্যর্থ হয়,  আমাদের দলগুলো যদি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে না পারে, জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে ব্যর্থ হয় তবে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।

ইমামুল হক, উন্নয়ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, emamul.haque@gmail.com
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।