উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিকতা দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার পর উপমহাদেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করে। পাকিস্তান, ভারত এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশেও সেই ছোয়া এসে লাগে। সেই গণতন্ত্রের সুবাতাসের সঙ্গে কালের পরিক্রমায় যুক্ত হতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিবারতান্ত্রিকতা।
শুধু রাজনৈতিক দলই না, দেশের শাসনক্ষমতা পর্যন্ত পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে যুগ থেকে যুগে সঞ্চারিত হচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা বেনজীর ভুট্টো পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বেনজীর ভুট্টোর পর তার স্বামী আসিফ আলী জারদারি বর্তমানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আসিফ ও বেনজীর দম্পতির পুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব্ররত আছেন। আগামী দিনে বিলাওয়াল ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
অপরদিকে ভারতে আমরা দেখতে পাই, দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কন্যাও পরে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ইন্দিরা গান্ধীর পর তার ছেলে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। রাজীব গান্ধীর পরে তাদের রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের হাল ধরেন তার স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং বর্তমানে রাজীব ও সোনিয়া দম্পতির পুত্র রাহুল গান্ধী ভারতের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
কংগ্রেস ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তিশালী দল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হন তার কন্যা শেখ হাসিনা।
অপরদিকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরবর্তীতে তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলটির প্রধান নেতার ভূমিকায় আছেন জিয়া ও খালেদা দম্পতির সন্তান তারেক রহমান। আগামীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও সেটি আশ্চর্যজনক হবে না।
সুতরাং, উপমহাদেশের রাজনীতিতে আমরা দেখতে পাই পারিবারিক উত্তরাধিকারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হন। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ জড়িত রয়েছে। দীর্ঘ শতকের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসন ও রাজতান্ত্রিক শাসনের জালে উপমহাদেশীয়রা আবদ্ধ থেকে তাদের মধ্যে একধরনের দাসত্বমূলক চেতনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজতান্ত্রিক শাসনে অভ্যস্ত উপমহাদেশীয়রা তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবারতান্ত্রিকতাকে বিশেষ স্থান দেয়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা হওয়ায় দলের মধ্যে একক ব্যক্তির একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার হয় এবং দলগুলোর মধ্যে নেতৃপূজা নামক এক ধরনের প্রথা চালু হয় যা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিকে আরো বেশি প্রমোট করে। যার ফলশ্রুতিতে দেবতাতূল্য নেতার উত্তরাধিকার পরবর্তীতে দেবতার স্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
রাজনৈতিক জ্ঞান সীমিত থাকা এবং উপমহাদেশের শিক্ষার হার ব্যাপকভাবে কম হওয়ায় সেই সুযোগ নিয়ে বরাবর বিভিন্ন গোষ্ঠী শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটার চেষ্টা করে। যার ফলশ্রুতিতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ডালপালা মেলতে শুরু করে। বংশমর্যাদা উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে আরও একটি ফ্যাক্টর। রাজার ছেলে অযোগ্য হলেও বংশমর্যাদার কারণে তাকেই উপমহাদেশীয়রা বরণ করে। অথচ যোগ্য কেউ বংশীয় না হওয়ায় রাজনীতিতে স্থান পায় না। অত্যন্ত নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, চেতনা এবং মূল্যবোধ প্রচলিত রয়েছে এই উপমহাদেশে যা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিকে বিকশিত হওয়ার বিস্তর সুযোগ প্রদান করে। প্রতিহিংসার রাজনীতির গুটি হিসেবে উপমহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে (ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান, বেনজীর ভুট্টো, জিয়াউর রহমান) হত্যা করা হয়েছে। যার ফলে আকস্মিক নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা যায় এবং দেশ, রাজনৈতিক দলের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে পরিবারের উত্তরাধিকাররা হাল ধরেন।
অনেক সময় পূর্বসূরীর স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বংশীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পরিবারতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। বংশ পরম্পরায় রাজনৈতিক মতাদর্শ সঞ্চারিত হয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে। পিতা যেই ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী সন্তান সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয় ফলে রাজনৈতিক সিস্টেমে পরিবারতান্ত্রিকতা অটোমেটিক্যালি ঢুকে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের দুর্বলতা, তাদের দলের ভিতরে গণতান্ত্রিক ধারণা প্রয়োগের অভাবে এবং একক নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবারতান্ত্রিকতা জায়গা করে নেয়। নীচ গণতান্ত্রিক কালচার স্বজনপ্রীতিকে অন্ধভাবে সমর্থন করে যা পরবর্তীতে পারিবারিক রাজনীতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিবারতান্ত্রিক এই রাজনীতির শেকলে আবদ্ধ থাকায় উপমহাদেশে সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব পূর্ণরূপে বিকশিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন সময়ে যোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যথাযথ স্থানে স্থানান্তরিত না হওয়ায় দেশ তার যোগ্য উত্তরসূরীকে হারাচ্ছে। সেইসঙ্গে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক শিষ্টচার, আচার, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।