বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বরাবরই প্রভাবশালী, যেন এক মহাসমুদ্র যার ঢেউ সবকিছুকে ছুঁয়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই পরাশক্তির প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর গভীর মনোযোগ দিয়ে আসছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের দৃষ্টিও ছিল এবারের মার্কিন নির্বাচনের দিকে। বিশেষত বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জয় বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, এবং অভিবাসন নীতিতে কী কী গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় এক প্রভাবশালী চালকের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা যায়।
মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় বিশ্বজুড়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, বিশেষত বাংলাদেশে। সামনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি কেমন হবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার ইস্যুতে উভয় দেশের সম্পর্কের মধ্যে শীতলতা ছিল স্পষ্ট। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান একে অপরের বক্তব্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির মেঘ জমিয়েছে।
তবে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক ধীরে ধীরে উষ্ণতার স্পর্শ পাচ্ছে। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সম্ভাবনা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল। ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি পদে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ওপর তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রভাব না ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে এর উভয় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে—কখনো ইতিবাচক, কখনো নেতিবাচক।
বর্তমানে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শুল্কনীতি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। ট্রাম্প চীনের বাইরে অন্য সব দেশের আমদানিতে ১০% শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন, আর চীনের ক্ষেত্রে এই হার বাড়িয়ে ৬০%, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০% পর্যন্ত করার কথা বলছেন। বিশেষত, মার্কিন বাজারে চীনের ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, সোলার উপকরণ, এবং মোবাইল প্রযুক্তি রপ্তানিতে বড় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। যা একপ্রকার প্রযুক্তি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তবে, এই শুল্কনীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিতে পারে। চীনের জন্য মার্কিন বাজারে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ নিজেকে আরও শক্তিশালী রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান ৯% শেয়ার নিয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ইতোমধ্যেই মজবুত। তুলনামূলক কম শুল্কের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এই অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে, যদি ট্রাম্প তার কিছু “বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্রকে” শুল্ক সুবিধা দিয়ে এগিয়ে রাখেন, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে, চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাধা এড়াতে চীন দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে তার প্রভাব বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার হয়ে উঠতে পারে। তবে, এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নীতি সহায়তা, এবং শ্রমশক্তির দক্ষতার ওপর।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ইতিহাসের পাতায় ইতোমধ্যেই মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করার নজির রেখেছে, এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী। বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে ডলারের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, ট্রাম্পের নীতি মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে, ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে উচ্চ সুদহার আরোপ করতে বাধ্য হতে হবে। বিশ্বব্যাপী ডলারের এই দাপট বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যেই চাপের মুখে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও সংকটের মুখোমুখি হবে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি আমদানির খরচ বাড়াবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে। রপ্তানি আয়ে কমতি এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে, যা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জটিল বুননে চীনের প্রভাব একটি অপরিহার্য উপাদান। যুক্তরাষ্ট্র কখনো বাংলাদেশকে সরাসরি নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না, বরং বাংলাদেশের প্রতি তাদের দৃষ্টি ভারতের চোখ দিয়ে পরিচালিত হয়, আর ভারতকে তারা মূল্যায়ন করে চীনের প্রেক্ষাপটে।
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতার অন্যতম কারণ চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এশীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নকশায় বাংলাদেশ একটি কৌশলগত উপাদান মাত্র আর এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হলো চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা। ট্রাম্পের শাসনামলে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র এবং সুসংগঠিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, চীনের সাথে এই বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখতে হলে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কৌশলগতভাবে পাশে রাখবে আর সেই সম্পর্কের জালে বাংলাদেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হয়ে থাকবে।
অবস্থা বিবেচনায় ধারণা করা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে চাইবে না। তাদের মূল লক্ষ্য এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা। কারণ, আকারে ছোট হলেও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির প্রেক্ষিতে। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরীয় অবস্থান সরাসরি ভারত মহাসাগরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি এবং বাণিজ্যিক রুটের জন্য অমূল্য। এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই লাভবান হবে। তাই, স্থিতিশীল বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক খেলায় একটি মূল্যবান অংশীদার হিসেবে রয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশ যেমন সুযোগ পেতে পারে, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে পারে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে একটি চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের, বিশেষ করে মোদি সরকারের প্রভাব আরও সুসংহত এবং বিস্তৃত হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। চীনের বাড়তি প্রভাব রুখতে ট্রাম্পের কৌশলগত নকশায় ভারতের সম্পূর্ণ সহযোগিতা কার্যত অবশ্যম্ভাবী। যদিও ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অনেকেই অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরেন, বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ মন্ত্রকে সামনে রেখেই গড়ে উঠবে। এই সিদ্ধান্তগুলোতে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের চেয়ে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাই প্রাধান্য পাবে।
এদিকে, ট্রাম্পের বিজয়ের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর কোনো অপ্রত্যাশিত চাপ আসবে বলে ধারণা করা কিছুটা অবাস্তব। কারণ বর্তমানে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে নেওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতির সঙ্গে একেবারে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমার মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক শাসন পুনর্বহালের প্রক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। সেই সাথে এই সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য এক ইতিবাচক সংকেত—গণতন্ত্রের পথে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিত্রের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।
তবে সার্বিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ বয়ে আনতে পারে, তেমনি খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন জানালা।