প্রবাসীর চোখে: উগ্র জাতীয়তাবাদ ও অভিবাসন, ইউরোপীয় সমাজের বিভাজন-বিরোধ

গত কয়েক বছরে ইউরোপের রাজনীতিতে এক নতুন সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসনবিরোধিতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তার। ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং সর্বশেষ পর্তুগালের মতো দেশে এক সময়ের সহানুভূতিশীল অভিবাসন নীতি আজ কঠোরতা, সংশয় ও বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে। ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে এবং অভিবাসনকে ইউরোপীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করছে।

আজকের ইউরোপে অভিবাসন কেবল অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত ইস্যু নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতিগত পরিচয় ও সাংস্কৃতিক নির্মাণের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফ্রান্সে মেরিন লে পেন, হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবান, ইতালিতে মাটিও সালভিনি এবং পর্তুগালে আন্দ্রে ভেনচুরা—এই নেতারা অভিবাসনবিরোধী বার্তা ও প্রচারণার শীর্ষে অবস্থান করছেন। ভেনচুরার দল শেগা  অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তাদের বিবৃতিতে অভিবাসীরা অপরাধ বাড়ায়, সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং ইউরোপীয় পরিচয়কে বিপন্ন করে তোলে।

এই প্রবণতা ইউরোপের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করছে। অভিবাসীদের ভাষা, পোশাক, ধর্ম ও জীবনধারাকে ইউরোপীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। ফলে গড়ে উঠছে এক ধরনের ‘অপরতা’র সংস্কৃতি—যেখানে অভিবাসী মানেই অনুপ্রবেশকারী, সংস্কৃতিভ্রষ্ট, এবং এক ধরনের সম্ভাব্য হুমকি।

এই মনোভাব কেবল রাষ্ট্রীয় নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের প্রতিদিনের আচরণে তা প্রতিফলিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি পারিবারিক পরিসরেও অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্য, অবজ্ঞা ও অবিশ্বাস বাড়ছে। এর ফলে অভিবাসীদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নিঃসঙ্গতা, নিরাপত্তাহীনতা ও সমাজবিচ্ছিন্নতার অনুভব। এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়—গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর জন্যও এটি এক গভীর হুমকি।

একসময় ইউরোপ মানবাধিকার, সমতা ও বৈচিত্র্যের সহাবস্থানের প্রতীক ছিল। এই উদার আদর্শই ইউরোপকে আধুনিক মানবিকতার দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু আজ উগ্র জাতীয়তাবাদের এই নতুন ঢেউ সেই দর্শনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জাতীয় পরিচয়ের নামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে একটি সংকীর্ণ ও একমাত্রিক বর্ণনা, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে ভয় ও ঘৃণার ওপর—ভয়, নিজের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলার; ভয়, ঐতিহ্য বিলীন হওয়ার।

এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ—সহনশীলতার ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়ের পুনর্গঠন। অভিবাসনকে কেবল একটি বোঝা হিসেবে না দেখে মানবিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখা জরুরি। ইউরোপে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তারা শুধু নিজেদের রক্ষা করতে নয়—নতুন সমাজে অবদান রাখতেও প্রস্তুত। ইতিহাস সাক্ষী—অভিবাসীরা ইউরোপে কর্ম, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবনের নতুন জোয়ার এনেছে।

এখন সময়, ইউরোপের ফিরে যাওয়ার তার মানবিক শিকড়ে। আজকের বৈচিত্র্যময় বিশ্বে “শুদ্ধ সংস্কৃতি” ধরে রাখার চেষ্টা কৃত্রিম এবং বিভাজনমূলক। প্রয়োজন এমন একটি সমাজব্যবস্থা, যেখানে ভিন্নতা হবে শক্তি—বিভাজনের কারণ নয়।

যদি ইউরোপ তার নেতৃত্বের নৈতিক অধিকার ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে ঘৃণার রাজনীতি নয়—গ্রহণ ও সহাবস্থানের রাজনীতি বেছে নিতে হবে। এটাই সময়, এক নতুন, মানবিক ইউরোপ গঠনের।

সজীব খান, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী, লিসবন, পর্তুগাল ।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।