ইতিহাসের দায় ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে হারারির নিরপেক্ষতা!

ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মৌলিক দায়িত্ব হলো সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বিখ্যাত লেখক ও ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি—যিনি স্যাপিয়েন্স বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন— তিনি গাজায় চলমান গণহত্যা, শিশুহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রশ্নে যে "ভারসাম্যপূর্ণ" অবস্থান গ্রহণ করেছেন, প্রশ্ন হচ্ছে: তিনি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, নাকি এক প্রকার কৌশলী পক্ষপাত দেখাচ্ছেন?

যে সত্যগুলো হারারির আলোচনায় অনুপস্থিত

ইসরায়েলের দখলদারিত্ব: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা একটি দখলকৃত ভূখণ্ড। জাতিসংঘের রেজুলেশন ২৩৩৪ (২০১৬) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০০৪ সালের পরামর্শমূলক মতামত ইসরায়েলের দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। তা সত্ত্বেও হারারি এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের জবরদস্তি উচ্ছেদ—এসব ইতিহাসের অধ্যায় তিনি নির্বিকারভাবে উপেক্ষা করেছেন।

গাজায় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়: জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বহু সংস্থা গাজায় ইসরায়েলি অভিযান তথা হত্যাকাণ্ড নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে "গণহত্যার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ" বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ হারারির বক্তব্য ছিল: “উভয় পক্ষের মৃত্যুই দুঃখজনক।”[৫] এই কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা আসলে অত্যাচারীর পক্ষে দাঁড়ানোর নামান্তর নয় কি?

বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের চিত্র: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইসরায়েলকে বর্ণবাদী (Apartheid) নীতির অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে । কিন্তু হারারির লেখালেখি বা বক্তব্যে এসব নিয়ে কোন আলোচনা পাওয়া যায় না। ইতিহাসবিদ হিসেবে এই জাতিগত বিভেদ এবং বর্ণবাদের ইতিহাস উন্মোচন করা কি তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল না?

বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ: ইসরায়েলি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অবৈধ বসতি স্থাপন ফিলিস্তিনিদের ধীরে ধীরে ভূমি থেকে উৎখাতের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। ২০২৩ সালে পশ্চিম তীরে উচ্ছেদ এবং সহিংসতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে অবৈধ বসতি স্থাপন আসলে জাতিগত নির্মূলনীতিরই আধুনিক রূপ। তবু হারারি এসব বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে  নীরব থেকেছেন।

বুদ্ধিজীবীর নীরবতা কি পক্ষপাতেরই আরেক নাম?

হারারি প্রায়ই বলেন, “উভয় পক্ষের গল্প শোনা দরকার” । কিন্তু ইতিহাসবিদদের দায়িত্ব কেবল গল্প শোনা নয়, বরং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা। একদিকে দখলদার রাষ্ট্র এবং অন্যদিকে নিরস্ত্র জনগোষ্ঠী—এই দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্যের দোহাই দেওয়া আসলে কেবলি বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা বৈ কিছু নয়। নোয়াম চমস্কি একবার বলেছিলেন, “নিরপেক্ষতার দাবি করাই হলো নিপীড়কের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার”। সত্যিকার অর্থে ইতিহাসবিদদের নিরপেক্ষতার আড়ালে অন্যায়ের প্রতি সহনশীলতা দেখানো উচিত নয়।

এডওয়ার্ড সাঈদ, ইলান পাপ্পে, নরম্যান ফিনকেলস্টাইনের মতো বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল হয়ে আছেন—তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। সাঈদ ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বর হয়েছিলেন, পাপ্পে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ উন্মোচন করেছিলেন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে, আর ফিনকেলস্টাইন নরম্যান ইহুদি হয়েও ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের দলিল প্রকাশ করেছিলেন। অথচ হারারি? তিনি টেড টক-এ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তৃতা দেন, কিন্তু বর্তমানে এইরকম দৃশ্যমান গণহত্যা এবং রক্তপাত দেখেও "নিরপেক্ষ" থাকেন! ৫৪ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে যার ৭০℅ নারী এবং শিশু। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা বন্ধ করে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে মৃত্যুর অপেক্ষায়। নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছে শহরের পর শহর৷ হারারি তারপরও কি বিশ্বাস করেন যে, দখলদার বাহিনী ও উচ্ছেদ হওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে "ন্যায়-অন্যায়" সমান? তিনি নির্যাতক ও নির্যাতিতের মধ্যে "ভারসাম্য" খুঁজে—একটি রক্তাক্ত হাতকে কি ধোয়া-মোছার সুযোগ করে দিয়েছেন?

ইতিহাসবিদ হিসেবে হারারির বিশ্লেষণী দক্ষতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু সমকালীন সংকটে তার নিরপেক্ষ ভঙ্গি আসলে নির্যাতকের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবেই ধরা পড়ে। ভবিষ্যতের ইতিহাস যদি এই সময়কে মূল্যায়ন করে, তাহলে হারারির ভূমিকা তাতে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে। দান্তের ভাষায়: "নরকের সবচেয়ে অন্ধকার জায়গাগুলো সেইসব লোকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, যারা নৈতিক সংকটের সময় নিরপেক্ষ থাকে।” (The darkest places in hell are reserved for those who maintain their neutrality in times of moral crisis.)

জোবায়ের আহমদ শামীম, সাবেক শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।