পেটের ডান দিকে হঠাৎ এমন তীব্র ব্যথা শুরু হওয়ার পর মনে হলো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অ্যান্টাসিড খেয়ে ভাবলেন, ‘হয়তো রাতের ভারী খাবারটার জন্যই গ্যাস হয়েছে!’ কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হলেও ব্যথা কমার নাম নেই। শেষমেশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসক যখন জানালেন - ‘আপনার পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে’, তখন অনেকেরই আঁতকে ওঠার কথা।
বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের যত ধরনের রোগ দেখা যায়, তার মধ্যে পিত্তথলির পাথর বা গলস্টোন অন্যতম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি যতটা সাধারণ, অবহেলা করলে এর পরিণতি হতে পারে ঠিক ততটাই বিপদজনক।
আমাদের যকৃত বা লিভারের ঠিক নিচে ছোট্ট একটি থলির মতো অঙ্গ হলো পিত্তথলি। দেখতে ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মতো। লিভার প্রতিদিন যে পিত্তরস তৈরি করে, তা সাময়িকভাবে জমা রাখাই এর কাজ। আমরা যখন চর্বিজাতীয় খাবার খাই, তখন এই পিত্তরস খাবার হজমে সাহায্য করে।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন ও পিত্ত লবণের সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি নষ্ট হয়ে যায়। এই উপাদানগুলো থিতিয়ে পড়ে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি করে, যা সময়ের সাথে জমে রূপ নেয় কঠিন পাথরে। চিকিৎসকদের মতে, তৈরি হওয়া পাথরের ৮০% মূলত জমা থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল।
কারা ঝুঁকিতে
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা '৫এফ' -র সূত্রটি মনে রাখেন। এই সূত্রের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:
Female (নারী): পুরুষের তুলনায় নারীদের এই সমস্যা হওয়ার প্রবণতা দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
Forty (৪০ বছর বয়স): বয়স ৪০ পেরোলেই ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
Fat (স্থূলতা): অতিরিক্ত শারীরিক ওজন এবং রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল।
Fertile (গর্ভধারণের বয়স): গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পাথর জমার প্রবণতা বাড়ে।
Fair (ফর্সা ত্বক): ভৌগোলিক ও জিনগত কারণে পশ্চিমা ও ফর্সা ত্বকের মানুষের মধ্যে এর হার বেশি।
তবে আধুনিক যুগে প্রক্রিয়াজাত ফাস্টফুড, কায়িক পরিশ্রমের অভাব আর ক্র্যাশ ডায়েটের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও পিত্তপাথরের সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দ্রুত ওজন কমাতে গিয়ে মাসে ৪-৫ কেজির বেশি ওজন ঝরিয়ে ফেলাও কিন্তু পিত্তথলির পাথর জমাট বাঁধার কারণ।
উপসর্গ
বিস্ময়কর বিষয় হলো, বহু মানুষের শরীরে বছরের পর বছর পিত্তপাথর বয়ে চললেও তারা বিন্দুমাত্র টের পান না। অন্য কোনো পরীক্ষার সময় দুর্ঘটনাবশত এটি ধরা পড়ে। তবে পাথর যখন পিত্তরস চলাচলের নালীতে বাধা সৃষ্টি করে, তখনই শুরু হয় আসল যন্ত্রণা।
তেল বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর পেটের ডানপাশের উপরিভাগে তীব্র ব্যথা, যা কাঁধ বা পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে - এটিই এই রোগের প্রধান উপসর্গ। সঙ্গে যোগ হতে পারে পেটে গ্যাস, বদহজম কিংবা বমি ভাব।
তবে সতর্ক হতে হবে কিছু বিপদজনক লক্ষণে। যদি পেটে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে জন্ডিসের রূপ নেয় কিংবা মলের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে পাথর পিত্তনালী আটকে সংক্রমণ বা অগ্ন্যাশয়ে তীব্র প্রদাহ (প্যানক্রিয়াটাইটিস) তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
ভ্রান্ত ধারণা ও আধুনিক চিকিৎসা
পিত্তথলির পাথর নিয়ে আমাদের সমাজে কবিরাজি বা আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেয়ে ‘গলিয়ে ফেলার’ নানা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। তবে চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য - ওষুধ দিয়ে পাথর গলানোর চেষ্টা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তীতে আরও জটিল রূপ নেয়।
রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ডই এটি শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট। আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত সমাধান হলো ‘ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি’।
অনেকে ভয় পান - পিত্তথলি কেটে ফেলে দিলে হয়তো আজীবন হজমের সমস্যা হবে! চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করে জানান, পিত্তথলি অপসারণ করলেও লিভার কিন্তু পিত্তরস তৈরি বন্ধ করে না। তা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে হজমে সাহায্য করে। ফলে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
প্রতিরোধেই মুক্তি
শতভাগ প্রতিরোধ হয়তো সম্ভব নয়, তবে জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব:
- শাকসবজি, ফলমূল ও প্রচুর ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার ডায়েটে যুক্ত করা।
- অতিরিক্ত চর্বি, প্রক্রিয়াজাত চিনি ও ফাস্টফুড পরিহার করা।
- ওজন কমাতে গিয়ে অতি-উৎসাহী না হয়ে ধীরগতিতে সুস্থ নিয়মে ওজন কমানো।
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম করা।
পেটের ডানদিকের সামান্য ব্যথাকে সাধারণ গ্যাস ভেবে এড়িয়ে যাওয়া বন্ধ করাই হতে পারে সচেতনতার প্রথম ধাপ। পিত্তথলির পাথর সাধারণ মনে হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি জটিলতা তৈরি করতে পারে।