আড়াই বছর ধরে পুরো বিশ্ব ভুগছে করোনাভাইরাস মহামারিতে। মাস কয়েক আগে হানা দিয়েছে মাঙ্কিপক্সও। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে মারবার্গ নামক নতুন আরেক প্রাণঘাতী ভাইরাসের উপদ্রব।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিসংক্রামক মারবার্গ ভাইরাসে ঘানায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে ৯৮ জনকে কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়েছে। ফলে নতুন করে ভাইরাসটির ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা জেগে উঠেছে।
১৯৬৭ সালে সর্বপ্রথম মারবার্গ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। দক্ষিণ এবং পূর্ব আফ্রিকার মানুষরাই এ অতিসংক্রামক প্রাণঘাতী ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। আফ্রিকায় এর আগে এ ভাইরাসে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
মারবার্গ ভাইরাসে আক্রান্তদের ডায়রিয়া, জ্বর, বমি বমি ভাব এবং বমির উপসর্গ দেখা দেয়। ইবোলা ভাইরাসের মতো এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হঠাৎ অসুস্থতা শুরু হয়, তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা দেখা যায়। মারবার্গ ভাইরাসে মৃত্যুর হার ২৪-৮৮% পর্যন্ত।
মারবার্গ ভাইরাস কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, মারবার্গ মূলত আরেক প্রাণঘাতী ইবোলার সমগোত্রীয় একটি ভাইরাস। ১৯৬৭ সালে জার্মানির মারবার্গ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং সার্বিয়ার বেলগ্রাদে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ৩১ জন আক্রান্ত ও ৭ জনের মৃত্যু হয়।
উগান্ডা থেকে আমদানি করা সবুজ বানরে সর্বপ্রথম এ ভাইরাসটি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও এ ভাইরাসের যোগসূত্র মিলেছে। মূলত বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে এ রোগ সংক্রমিত হয়। তবে বাদুড়ের বসবাস আছে এমন গুহা ও খনিতে দীর্ঘদিন অবস্থান করা ব্যক্তির মাধ্যমেও এ রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানায় প্রথমবারের মতো মারবার্গ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। তবে এর আগে ডিআর কঙ্গো, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা ও জিম্বাবুয়ের মতো আফ্রিকান দেশগুলোতেও এ রোগের সংক্রমণ দেখা গিয়েছে।
২০০৫ সালে অ্যাঙ্গোলায় এ ভাইরাস ৩২৯ জন মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০১২ ও ২০১৭ সালে উগান্ডায় যথাক্রমে এ ভাইরাসে ৪ এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়। তাছাড়া, ১৯৯৮-২০০০ সালের মধ্যে ডিআর কঙ্গোতে এ ভাইরাসে ১২৮ জন মারা গিয়েছিল।
কিন্তু ইউরোপে মারবার্গ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ৪০ বছরে মাত্র এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। উগান্ডার একটি গুহায় খনন কাজ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরা একজনেরও মৃত্যু হয়েছে।

মারবার্গে আক্রান্ত হলে যেসব রোগ এবং উপসর্গ দেখা যায়
মারবার্গ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রথমদিকে জ্বর, ভীষণ মাথাব্যথা ও পেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। তিন দিন পর পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং বমি শুরু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চেহারায় ভূতের মতো বৈশিষ্ট্যে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে চোখ ডেবে যাওয়া, অভিব্যক্তিহীন মুখ এবং চরম আলস্য।
তাছাড়া, অনেক রোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হয়। প্রচুর রক্তক্ষরণ ও চোটের কারণে অসুস্থ হওয়ার ৮ থেকে ৯ দিনের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হয়।
মারবার্গ ভাইরাস যেভাবে ছড়ায়
মূলত মিসরীয় এক প্রজাতির বাদুড় মারবার্গ ভাইরাস বহন করে। পাশাপাশি আফ্রিকার সবুজ বানর ও শুকরও এ ভাইরাস বহনে সক্ষম।
দৈহিক তরল এবং আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে এ রোগ ছড়ায়।
এমনকি সুস্থ হওয়ার পরও বেশ কয়েক মাস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বীর্য থেকে অনেকের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

যেভাবে চিকিৎসা করা হয়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, মারবার্গ ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা টিকা নেই। তবে বেশ কয়েকটি রক্ত পণ্য, ওষুধ এবং রোগ প্রতিরোধ (ইমিউন) থেরাপি উদ্ভাবিত হয়েছে।
আর চিকিৎসকরা হাসপাতালে ভর্তি রোগীর শরীরে প্রচুর তরল ও হারানো রক্ত প্রতিস্থাপন করে উপসর্গ উপশম করতে পারেন।
যেভাবে মারবার্গ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়
টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণের পক্ষে প্রচারণা চালানো আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্যাভি’র ভাষ্যমতে, আফ্রিকার মানুষের স্থানীয় বণ্যপ্রাণীর মাংস খাওয়া বন্ধ করা উচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে,, সংক্রমণ ছড়ানো এলাকায় মানুষের উচিত শুকরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
সুস্থ হওয়ার এক বছর বা দুই বার পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত পুরুষদের উচিত যৌনমিলনের সময়ে কনডম ব্যবহার করা।
এছাড়া, মারবার্গ ভাইরাসে মৃত ব্যক্তির দাফন বা সৎকারে নিয়োজিত ব্যক্তিদের উচিত মরদেহের সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকা।