পাউঠি: পিতৃঋণ পরিশোধের সফল প্রচেষ্টা

অমর একুশে বইমেলায় টাঙ্গন প্রকাশন থেকে এ বছর প্রকাশ পেয়েছে কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক শফিক আশরাফের উপন্যাস “পাউঠি”। পাউঠি মূলত তাঁতীদের জীবনের লড়াই-সংগ্রাম, যুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস।

উপন্যাসিক শফিক আশরাফ যেখানে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠেছেন সেটি একটি তাঁত অধ্যুষিত এলাকা। ফলে উপন্যাসের পরতে পরতে সুনিপুণভাবে বর্ণনা করতে পেরেছেন তাঁত, তাঁতী ও তাদের সুখ-দুঃখের কথা।

“পাউঠি”র শুরুতেই দেখতে পাই বাঙালি জাতিসত্ত্বা পরিচয়ের যে কঠিন সংগ্রাম- মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ এবং সেখানে সেসময়ে জন্ম নেওয়া নবজাতক রফিকের দুর্বিসহ জীবনের চিত্র। যুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষ ও একজন তাঁত ব্যবসায়ীর দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা। আত্মমর্যাদাবোধের উপলব্ধি প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে গল্পের মূল চরিত্র রফিকের বাবা মতিউদ্দিন চরিত্রের ভেতরে। শত অভাবের তাড়নার কাছে মাথা নত না করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য বদলের চেষ্টা করেছেন এবং সফল হয়েছিলেন। 

আমরা বাহারি রঙের শাড়িতে নারীর রূপ উপলব্ধি করি। কিন্তু সেই শাড়ি বুননের পরতে পরতে যে গল্প তা কখনো খুঁজতে যাইনি। অথবা একজন শাড়ির কারিগরের হাত এবং চোখ কখনো ছুঁয়ে দেখতে চাইনি। তাঁত ব্যবসায়ীক মাধ্যম হলেও এটি যে একটি শিল্প এবং ক্রমান্বয়ে এই শিল্পের অবমূল্যায়নের ফলে তা যে ধ্বংসের পথে এর বয়ানই উঠে এসেছে “পাউঠি”তে।এই ধ্বংসকে রোধ করতে কিংবা পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে একজন তাঁতীর সন্তান হিসেবে গল্পের চরিত্র রফিক তার সন্তানদের নাম রাখার মাধ্যমে পরিচয়কে অর্থবহ করে রাখার ঘটনা যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার জন্য নিঃসন্দেহে লেখক প্রশংসার দাবীদার।

তাঁতী জাতিসত্ত্বারও যে একটি নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব বলয়ের সঙ্গীত রয়েছে তা খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষই অবগত রয়েছেন। কিন্তু তাঁতী ও তাঁত নিয়ে রচিত লোকসঙ্গীতও যে তাঁতীদের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাওয়ার পথে উপন্যাসিক তা সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁতী সম্প্রদায়ের অবস্থানের পূর্বাপর চিত্র। তাঁতীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা প্রবঞ্চনার কথাও এসেছে উপন্যাসে। কখনো প্রতিবাদী, কখনো সহনশীল রফিককে কেন্দ্র করে তাঁতীদের জাগতিক জীবনের নানান অধ্যায়কে দেখিয়েছেন শফিক আশরাফ। 

উপন্যাসিক শফিক আশরাফ খুব কৌশলে নতুন একটি ধারা সূচনা করার চেষ্টা করেছেন। আত্মপরিচয়ের পাশাপাশি ইতিহাসের পাতায় একটি জাতির বিবরণ কীভাবে স্থান পেয়েছে বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখায় তাও ফুটিয়ে তুলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে উপন্যাসটিতে ভিন্ন একটি মাত্র যোগ করেছে। ইতিহাসনির্ভর হওয়ায় এটি কালক্রমে ঐতিহাসিক হিসেবেও একটি জায়গা দখল করে নিতে পারে। 

তাছাড়া একাত্তর পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা, তাঁত ও তাঁতীদের বিবর্তন উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। 

কিছু অসর্তকতাজনিত ভুল কিংবা বানান বা স্থানের নামে বিঘ্ন ঘটলেও, “পাউঠি” যেভাবে বয়নশিল্পকে নতুন করে একটি মোড়কে বুনন হয়েছে তা প্রসংশার দাবী রাখে। তাছাড়া বুনন শিল্পের বর্ণনা যেভাবে উঠে এসেছে, উপন্যাসের নামকরণের উপন্যাসিক এখানে স্বার্থক বলেই প্রতীয়মান হয়।

“পাউঠি” পাঠ করে আশারাখি পাঠকেরও মনে হতে পারে- একজন লেখক সত্যিই তার পিতৃঋণকে পরিশোধের চেষ্টা করে চলেছেন।