রাত পোহালেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। এবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের তালিকায় রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি রয়েছেন চিত্রজগতের অভিনেতা, অভিনেত্রী, সঙ্গীতশিল্পী ও খেলার মাঠের তারকারা। ভোটের মাঠে তারকাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় নির্বাচনে প্রার্থী হতে দেখা গেছে বিনোদন জগতের তারকাদের। তবে ভোটের মাঠে বিনোদন জগতের তারকাদের সচারচর দেখা গেলেও কবি সাহিত্যিকদের তেমন একটা দেখা যায়না।
কিন্তু কবিরাও নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছিলেন। ভোট চাইতে ঘুরে বেরিয়েছিন দ্বারে দ্বারে। আর এই কাজে সবার আগে যে নামটি আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
১৯২৬ সালের কথা। ওই বছরের শেষ দিকে “ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা” নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম তখন সারা বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। ঢাকা বিভাগ থেকে আইনসভায় দুজন মুসলিম প্রতিনিধির কোটা ছিল। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস সমর্থিত স্বরাজ দলের প্রার্থী হন কাজী নজরুল ইসলাম।
বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত একটি আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
কবির ধারণা ছিল, বাংলার মানুষ যেভাবে তাকে ও তার কবিতাকে যেভাবে ভালোবাসে, তাতে নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।
ফরিদপুরের এক জনসভায় কবি জসীমউদ্দীনকে তিনি বলেছিলেন, “জসীম, তুমি ভেবো না। নিশ্চয়ই সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা ৯৯টি ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি কিছু পাই, তাহলেই কেল্লাফতে।”
কিন্তু ভোটের মাঠে নেমেই বদলে যেতে থাকে কবির অভিজ্ঞতা। কারণ, রাজনীতি আর ভোটের হিসাব তো ভিন্ন। কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই খরচ নিয়ে বিপাকে পড়েন বিদ্রোহী কবি। নির্বাচন করতে কেমন টাকা লাগে, সে ব্যাপারে তার কোনো ধারণা ছিল না। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে তেমন কোনো বাজেট ছিল না তার। তাই নির্বাচনে তার পক্ষে প্রচারণায় লোক কম দেখা যায়।
প্রচারণার জন্য ঢাকার বেচারাম দেউড়ির ৫২ নম্বর বাড়িতে পীর সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ ইউসুফ কাদেরীর আস্তানায় বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন নজরুল। ফরিদপুরেও মাঠপর্যায়ে কাজ করেছিলেন কয়েক দিন। কিন্তু বাজেট–স্বল্পতায় নির্বাচনি এলাকার সবখানে যেতে পারেননি।
ফরিদপুরের এক পীরের কাছ থেকে একটা ফতোয়া লিখেও নিয়ে এসেছিলেন কবি, যাতে লেখা ছিল, সবাই যেন তাকে ভোট দেয়। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভোটের মাঠে ভরাডুবি ঘটে বিদ্রোহী কবির।
সে সময়ে শুধু সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটার হওয়ার নিয়ম থাকায় বিরাট এলাকা নিয়ে গঠিত আসনে মোট ভোটার ছিল ১৮,১১৬ জন। ফলাফলে দেখা যায়, মাত্র ১ হাজার ৬২টি ভোট পেয়ে পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হন তিনি। সে সময় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
নজরুলের এমন ভরাডুবির পর ভোটের মাঠে নাম লিখিয়েছিলেন আরেকজন কবি। তিনি কবি নির্মলেন্দু গুণ। নজরুলের ব্যর্থতার ৬৫ বছর পরের ঘটনা। ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছিলেন তিনি। মার্কা পেয়েছিলেন - কুমির। সেসময় কুমিরে সিল পড়েনি তেমন। কাজী নজরুল ইসলামের মতো তারও জামানত বায়জাপ্ত হয়।
সূত্র: গোলাম মুরশিদের লেখা নজরুল–জীবনী বিদ্রোহী রণক্লান্ত ও জসীমউদ্দীনের লেখা জীবনকথা।