জোট শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আগামী ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। এ নিয়ে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২৯৮টি আসনে নৌকার প্রার্থী ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এখন আসন সমঝোতা হলে বেশ কয়েকটি আসন থেকে নৌকা হারাতে হবে দলীয় প্রার্থীদের। নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক করতে দলের এই সিদ্ধান্ত মানতে হবে তাদের। আসন সমঝোতাকে ঘিরেই মূলত নানা ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী শিবিরে।
এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ২৯টি দল। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকটি দল তাদের প্রার্থী তালিকা নির্ধারণে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাদের মধ্যে অনেক প্রার্থীই ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা নিয়ে লড়তে চান; আবার কেউ নিজেদের দলীয় প্রতীকে আওয়ামী লীগের “নেক নজরে” নির্বাচনের মাঠে থাকতে চান।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা রবিবার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে চূড়ান্ত তালিকাসহ নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেবেন দলীয় প্রধান।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে বড় কোনো রাজনৈতিক একক শক্তি অংশ না নেওয়ায় নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক করতে নানা কৌশল নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে না। ভোটকেন্দ্রে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিতে ও নির্বাচনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, দলীয় শরিক ১৪ দলের জোটের সদস্যরা ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দল কয়েকটি আসন দাবি করছে। নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে তাদের দাবিও বিবেচনা করা হতে পারে।
ক্ষমতাসীন দলটি প্রাথমিকভাবে জাতীয় পার্টি (এরশাদ), তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও আরও কয়েকটি ইসলামী দলকে কিছু আসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কীভাবে এই আসন সমন্বয় করা হবে তা জানা যায়নি।
বিএনপিবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির বাইরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল তৃণমূল বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান শমসের মুবিন চৌধুরী ও মহাসচিব তৈমুর আলম খন্দকারসহ পাঁচজন ছাড় পাওয়ার আলোচনায় রয়েছেন।
শমসের মুবিন চৌধুরীকে সমর্থন দিতে সিলেট-৬ থেকে নৌকার প্রার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদকে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে তৈমুর আলম খন্দকারের জন্য সরে যেতে হতে পারে গোলাম দস্তগীর গাজীকে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বর্তমানে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য। এবার এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়েছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে। এই আসনে এবার মনোনয়ন জমা দেননি মেমন। তিনি বরিশাল-২ ও বরিশাল-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সূত্র জানায়, মেননকে বরিশাল-২ আসনটি ছেড়ে দিতে পারে আওয়ামী লীগ।
ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, “আওয়ামী লীগ জোট শরিকদের নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আসন সমঝোতা করা হবে।”
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সন্ধ্যায় তার বাসভবনে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের নিয়ে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে জাতীয় পার্টি থাকবে কিনা- তা নিয়ে সংশয় রয়েছে আওয়ামী লীগে। জাপার সঙ্গে আসন সমঝোতাও নির্ভর করছে ভোটের মাঠে তাদের পাবে কিনা।
মন্ত্রিসভার এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এবার যেকোনো কিছু হতে পারে। চূড়ান্ত তালিকা থেকে যেকোনো প্রার্থী বাদ পড়তে পারেন, এমনকি আমিও।”
ভোটের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে ১৫ নভেম্বরের পর। ওইদিন দ্বাদশ সংসদের তফসিল ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ইসি মনোনয়ন যাচাই-বাচাই করছে। আজই শেষ দিন যাচাই-বাচাইয়ের। আগামী ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। ১৮ ডিসেম্বর দেওয়া হবে প্রতীক বরাদ্দ। ওইদিন থেকেই ভোটের মাঠে প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা। আর সংসদে আসার ভাগ্য নির্ধারণ হবে ৭ জানুয়ারি। ওইদিন হবে জাতীয় সংসদের ভোট।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি দলের অংশগ্রহণে হয়েছিল ভোট। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর হওয়া এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট পায় ৩২.৫০% আর জাতীয় পার্টি পায় ৭.০৪% ভোট।
দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ১২টি দল। বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মধ্যে এই নির্বাচনে ৭২.১৪% ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষে ৭% ভোটার রায় দেন।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৩৯টি দল। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট পড়ে ৭৬.৮০%, ধানের শীষে ১৩.৫১% আর লাঙ্গলে ৫.৩৭% ভোট পড়ে। পরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয় জাতীয় পার্টি।