আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে তাদের নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কিছু সংগঠন। বৃহস্পতিবারের (২৪ অক্টোবর) মধ্যে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্ল্যাটফর্মটি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে তারা বৃহস্পতিবারের মধ্যে ছাত্রলীগকে নিধিদ্ধ করতে সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছে।
সম্প্রতি একই দাবি তুলেছেন আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করতে হবে।”
টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হত্যা, ধর্ষণ, হামলাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের রুমকে টর্চার সেলে পরিণত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে। এছাড়াও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, ব্যবসয়ী প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল বরাবরই। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সরকার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলে । ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা। সেই দাবির প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক হিসেবে আব্দুল হান্নান মাসুদ বলেন, “ছাত্রলীগের হাতে এখনো রক্ত লেগে আছে। যে ছাত্রলীগের হাতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। এই সপ্তাহের মধ্যে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে হতে।”
তবে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “জুলাই আগস্ট মাসে যারা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিচার সর্বপ্রথম করতে হবে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও রয়েছে। কিন্তু আমরা সেই রকম কিছু লক্ষ করছি না। ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার আগে সব থেকে বেশি জরুরি হলো দোষীদের বিচার করা।”
তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ করে কোনো সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ রাখা যায় না। আমরা ছাত্রলীগের নিষিদ্ধের পক্ষে নই। আমরা চাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্ত হোক। গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হলে তখন আর দখলদার সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে পারবে না। ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্ত না করে কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে না।”
এদিকে ছাত্রলীগের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল মনে করছে জুলাই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের আর রাজনীতি করার “নৈতিক অধিকার” নেই। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগ সরাসরি গণহত্যা চালিয়েছে। শুধু যে এই আন্দোলনেই গণহত্যা করেছে তা কিন্তু নয়। এর আগেও বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময় বিরোধীদের হত্যা নির্যাতন করেছে ছাত্রলীগ। এই পরিস্থিতিতে আসলে তাদের আর রাজনীতি করার অধিকার নেই। তারা বাংলাদেশে রাজনীতি করার ‘নৈতিক অধিকার’ হারিয়ে ফেলেছে। ছাত্রদল গণহত্যার দায়ে ছাত্রলীগের বিচার ও নিষিদ্ধ দাবি করছে।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, “আপনারা জানেন আমরা সরকার পতনের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে আন্দোলন করে যাচ্ছি। সকালে তারা মধুর ক্যান্টিনে জঙ্গি স্টাইলে স্লোগান দিয়েছে। দেখা যাবে কয়েকদিন পর তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। যারা এই দুঃসাহস দেখিয়েছে দুই দিনের মধ্যে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দেখতে চাই।”
তবে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের সঙ্গে ছাত্র শিবির ও ছাত্র সমাজকেও নিষিদ্ধে দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই সন্ত্রাসী ও স্বাধীনতা বিরোধী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হোক। ৯০ এর আন্দোলনের পর ঢাবিতে ছাত্র সমাজ ও শিবির নিষিদ্ধ ছিল। এখন তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে। এই সঙ্গে সন্ত্রাসী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগকেও নিষিদ্ধ করতে হবে ক্যাম্পাসগুলোতে।”
আইন করে ছাত্রলীগেকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “আইন করে নিষিদ্ধের ব্যাপারে এই মূহুর্তে আমরা কোনো মন্তব্য করছি না। কারণ, যখন যে সরকার আসে তারা নিজেদের মতো করে কাজ করে। এই বিষয়টি নিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”