মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা লুমুম্বা ও ডিআর কঙ্গোর ফুটবল

স্বাধীনতা সংগ্রাম আর লড়াইয়ের রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। দীর্ঘ ৫২ বছরের খরা কাটিয়ে অবশেষে ফুটবল বিশ্বকাপ মঞ্চে খেলতে নেমেছে তারা। ১৯৭৪ সালে কঙ্গো প্রথম ও শেষবারের মতো বিশ্বকাপে খেলেছিল, তখন দেশটিকে ‘জাইরে’ নামে ডাকা হতো। 

বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম শহর টেক্সাসের হিউস্টনে শক্তিশালী পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বিপ্লবী প্যাট্রিক লুমুম্বার উত্তরাধিকারীরা। 

তবে, এই ডিআর কঙ্গো জাতীয় ফুটবল দলের একনিষ্ঠ সমর্থক হচ্ছেন মিশেল কুকা এমবোলাদিঙ্গা, যাকে সবাই লুমুম্বা নামেই চিনে। প্রায় সব খেলায় তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে থাকেন। ফুটবল বিশ্বে তিনি পরিচিত- স্টেডিয়ামের যেকোনো জায়গায় ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকার কারণে। 

ফুটবল ভক্ত মিশেলের ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকার কারণ অনেকের না জানা। তার এই দাঁড়িয়ে থাকার পিছনে আছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রতিবাদ ও অনুপ্রেরণার গল্প। 

ডিআর কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী কমরেড প্যাট্রিস লুমুম্বাকে শ্রদ্ধা জানানোর অংশ হিসেবে তার মতোন কোট-চশমা পরিহিত হয়ে জাতীয় পতাকার রঙের পোশাক পরে পুরো ম্যাচ জুড়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন মিশেল। 

প্যাট্রিস লুমুম্বা ছিলেন কঙ্গোর তথা আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতীক, এক কমিউনিস্ট। ওর নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি  করেছিলো। লুমুম্বাকে সিআইএ আর বেলজিয়ান উপনিবেশবাদীরা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন। 

এর আগে, কঙ্গো থেকে হাতির দাঁত, রবার থেকে হীরে লুটে, সে দেশের ১ কোটির বেশি মানুষকে গণহত্যা করে, কব্জি কেটে বেলজিয়ান সম্রাট লিওপোল্ডরা মুনাফা করেছিলো। নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি করে নিয়েছিলো বিশাল কঙ্গোকে। আর সেই নির্মম অত্যাচারী সাদা সাহেবদের মহান বানিয়েছিলো হার্জের মতো লেখকরা, তার ‘কুখ্যাত’ বই কঙ্গোয় টিনটিনে তা উল্লেখিত আছে। এই উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধেই আফ্রিকায় লড়াই করেছিলেন চে গুয়েভারা। 

এবারের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে মার্কিন ভিসানীতির কারণে কঙ্গোকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কঙ্গোতে ইবোলা মহামারির কারণে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই বুধবার (১৭ জুন) পর্তুগালের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি অনেক ভক্তই। যাদের মধ্যে বাধার সম্মুখীন হন কঙ্গোর আইকনিক সমর্থক মিশেল। এই নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়ে প্রথমে বেলজিয়াম ও পরে ফ্রান্সে থাকতে হয় মিশেলকে। সেখানে তিনি কোয়ারান্টিনে ছিলেন ও মেডিকেল পরীক্ষা করেন। যাতে ইবোলা নেই তা নিশ্চিত হওয়া যায়। 

সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী পর্তুগালের বিপক্ষে চমক দেখিয়েছে ডিআর কঙ্গো। ১-১ গোলে ড্র করে মূল্যবান এক পয়েন্ট অর্জন করেছে দেশটি। 

তাদের লক্ষ্য- প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া। দলটির কোচ সেবাস্তিয়ান দেশাব্রে বলেছেন, “আমরা ড্র পেয়ে খুশি, কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। আমাদের লক্ষ্য গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে পরের রাউন্ডে ওঠা।” 

আগামী ২৪ জুন গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে কলম্বিয়ার মুখোমুখি হবে ডিআর কঙ্গো। এরপর ২৮ জুন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান।

ফুটবল শুধু খেলা নয়! ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে এমনই এক খেলা- যেখানে দেশ, রাজনীতি, মানুষ ও ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।