খেলোয়াড়ি জীবনে ফুটবলের রাজা পেলের সঙ্গে সান্তোসের নামটি জড়িয়ে ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে। শেষ দুই বছর নিউইয়র্ক কসমসে কাটানোর আগে ক্যারিয়ারের ১৮টি বছর সান্তোসেই পার করেন এই কিংবদন্তি।
মৃত্যুর পরেও সান্তোস আর পেলে মিলে গেলেন একই মোহনায়। ৪ জানুয়ারি, বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরে সান্তোসের ভিলা বেলমেরো স্টেডিয়ামের পাশেই অবস্থিত ১৪ তলার বিশাল সমাধিস্থল নেক্রপল একুমেনিকায় ফুটবলের রাজা পেলেকে সমাধিস্থ করা হয়। তার আগে ক্লাবের মাঠ ভিলা বালমিরো থেকে সমাধিস্থলে যাওয়ার আগে লাখ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাকে।
একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ জেতা পেলেকে শেষ বিদায় জানাতে দুই লাখ ৩০ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিল। তবে পেলের শেষযাত্রায় ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের ঢল নামলেও দেশেে অনেক সাবেক এবং বর্তমান তারকা ফুটবলাররাই হাজির ছিলেন না। পেলের শবযাত্রায় অনুপস্থিতির কারণে জিকো, রোমারিও, কাফু, রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা থেকে শুরু করে হাল আমলের নেইমার সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
অসুস্থতা এবং স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে ১৯৫৮, ১৯৬২ এবং ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী পেলের সতীর্থদের অনেকেই তার শেষযাত্রায় আসতে পারেননি। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে ব্রাজিলের সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যরাও পেলেকে শেষ বিদায় জানাতে আসেননি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের মধ্যে পেলের শেষকৃত্যে ছিলেন শুধুমাত্র মাউরো সিলভা। ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের মধ্যে কাফু, রিভালদো, রোনালদো, কাকা, রোনালদোরা আসেননি। এমনকি অনুপস্থিত ছিলেন সদ্য সমাপ্ত কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্কোয়াডে থাকা অনেকেও আসেননি দেশের ফুটবল ইতিহাসের শেষকৃত্যে।
পেলের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা। পেলের শেষযাত্রায় ব্রাজিলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হয়েছিলেন সাধারণ মানুষরাও। সেখানে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী সদস্যরা কেন ফুটবলের রাজার শবযাত্রায় উপস্থিত হলেন না, সেই বিষয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলো।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে পেলে ব্রাজিলের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করারর সময়ে স্বাভাবিকভাবে ব্রাজিলীয় ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের সমালোচনা করেছেন খোলাখুলিভাবে। তারকা ফুটবলারদের অনেকেই হয়ত সে কথা মনে পুষে রেখে আসেননি। কলামিস্ট কাসাগ্রান্দে তো সরাসরিই বলেছেন ব্রাজিলের অনেক তারকা ফুটবলার প্রকাশ্যে সহজে হাজির হতে চান না সহজে। কারণ, এজন্য তারা পারিশ্রমিক দাবি করেন।
এই তারকারা যদি পেলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকেও নিজেদের পেশাদারি আচারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, সেটি দুর্ভাগ্যজনক। ব্রাজিলের কলামিস্ট ওয়াল্টার কাসাগ্রান্দে জুনিয়র তো পেলের শেষকৃত্যে কাকাকে খুঁজে বলেই বসেছেন, কাকা কোথায়? তার কি এখানে আসা উচিত ছিল না?
পেলের শেষকৃত্যে ব্রাজিলের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী সদস্যদের অনুপস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করে দেশের সাবেক ফুটবলার নেতো বলেন, পেলে একজন কিংবদন্তি। তার মর্যাদা অনেকটা নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা মহাত্মা গান্ধীর সমপর্যায়ের। ব্রাজিলিয়ানরা প্রমাণ করল, তারা তাদের কিংবদন্তিকে প্রাপ্য মর্যাদা দিতে জানে না। বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারদের মধ্যে যারা এখনো জীবিত, তারা যদি পেলের শেষকৃত্যে না যোগ দেন, তখন আর কী বলা যায়!
তিনি আরও বলেন, তারকারা ইনস্টাগ্রাম বা টুইটারে পেলের একটা ছবি দিয়ে শুকনো কিছু কথা লিখেই দায়িত্ব সেরেছেন। পেলের শেষকৃত্যে তাঁদের অনুপস্থিতি ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ অনেক দিন মনে রাখবে। পেলের মতো একজন কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁরা যদি আসতেন, নিজেদের ছুটি থেকে দুই দিন ব্যয় করতেন, সেটি কি খুব বাড়াবাড়ি ধরনের চাওয়া হতো?
সমালোচনার মুখে ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী সদস্যদের মধ্যে রিভালদো এবং সেবারের অধিনায়ক কাফু নিজেদের অনুপস্থিতির কারণ জানিয়ে মুখ খুলেছেন। রিভালদো বলেন, যদি আমি ব্রাজিলেও থাকতাম, তবুও আমি এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারতাম না। আসলে এই সময়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বিষয়টি আমার পছন্দ না। তবে আমি এটির বিরুদ্ধে না। আমি পেলের সঙ্গে দেখা করেছি, কথা বলেছি এবং জীবনে তাকে সম্মান করার সুযোগ পেয়েছি। আমি প্রতি মুহূর্তে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানিয়েছি এবং তিনি এর জন্য সবসময় আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। পেলের জন্য আমার মনে শ্রদ্ধা এবং প্রশংসা রয়েছে তা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না এবং তার শেষকৃত্যে না গেলেও সেটি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক কাফু বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও কাজের ব্যস্ততায় অন্য জায়গায় থাকার কারণে পেলের শেষকৃত্যে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। তবে এ কারণে কি পেলের প্রতি আমার অবস্থান পরিবর্তিত হবে? না। আমার হৃদয়ে গেঁথে থাকবে সেদিনের কথা যেদিন পেলের সঙ্গে আমার দেখা হয় এবং তিনি আমাকে খেলা চালিয়ে যেতে বলেন। তিনিই ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। তার জাদুতেই জার্ডিম ইরিন (কাফুর জন্মস্থান) আজ চিরভাস্বর। এই দিনটি (পেলের মৃত্যুর দিন) ব্রাজিলের ইতিহাসে লেখা থাকবে। তবে চলে গিয়ে আপনি (পেলে) আমার কাছে চির সম্মানিতই থেকে যাবেন।
এছাড়া, নেইমার স্বশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও পেলের শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন তার বাবা নেইমার সিনিয়র। তিনি জানিয়েছেন, নেইমার নিজে হাজির হতে না পেরেই প্রতিনিধি হিসেবে তাকে এখানে যোগ দিতে বলেছেন।