এক যুগের চেয়েও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে হারের মতো তেতো স্বাদ কম পাননি নেইমার। তবে কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের হারের মতো পীড়া তাকে আর কোনো ম্যাচই দেয়নি। ক্রোয়েটদের কাছে সেলেসাওদের ওই পরাজয় নেইমারকেই এতটাই দুঃখ দিয়েছিল যে তিনি টানা পাঁচ দিন কেঁদেছিলেন।
হেক্সা জেতার স্বপ্ন নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে পা রেখেছিল ব্রাজিল। কিন্তু শেষ আটে ক্রোয়েশিয়ার সামনেই তাদের ছন্দপতন হয়। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য ড্র হওয়া ম্যাচ গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে নেইমারের দারুণ এক গোলে এগিয়েও যায় ল্যাটিন আমেরিকান পরাশক্তিরা।
সেমিফাইনাল যখন নিঃশ্বাস সমান দূরত্বে, তখনই খেই হারিয়ে বসে গোল হজম করে বসে ব্রাজিল। বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউট নামের ভাগ্যপরীক্ষায়। টাইব্রেকারে রদ্রিগো ও মার্কুইনহোসের পেনাল্টি ব্যর্থতায় ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-৪ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় সেলেসাওরা।
ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে কাতার বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর মাঠেই অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন নেইমার। ক্রোয়েটদের কাছে সেই হারের পর এখনও ব্রাজিলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাঠে নামেননি ৩১ বছর বয়সী উইঙ্গার। কি পাপিনিয়ো নামের এক ইউটিউব চ্যানেল দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর সেই কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করেন নেইমার।
ক্রোয়েশিয়ার কাছে হারে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের ছিটকে যাওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমার/সংগৃহীতনেইমার বলেন, “আমার মাথায় কী চলছিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। ওটা নিশ্চিতভাবে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক হার ছিল। আমি টানা পাঁচ দিন কেঁদেছিলাম। আমার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল বলে এটা আমাকে ব্যথিত করেছিল।”
ব্রাজিলিয়ান এ ফরোয়ার্ড আরও বলেন, “আমি গোল করব, তারা সমতা ফেরাবে এবং আমরা টাইব্রেকারে পরাজিত হব- এর চেয়ে আমার গোল না করাই ভালো ছিল। গোলশূন্য স্কোরলাইন থেকে না হয় টাইব্রেকারে হারতাম। এটা এমন এক কষ্ট, যা শুধু খেলোয়াড় ও স্টাফরাই বুঝতে পারেন।”
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ওই পরাজয়ের পর গোটা ব্রাজিল দল হতাশায় মুষড়ে পড়েছিল। সে সময় কেঁদেছিলেন দলের প্রায় সবাই। নেইমার জানান, তিনি আর কখনোই ওই মুহূর্তের সাক্ষী হতে চান না।
নেইমার বলেন, “ওটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে মুহূর্ত। মনে হচ্ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া; আপনার একপাশে কেউ একজন কাঁদছে, অন্য পাশে আরেকজন। যা ছিল ভয়ঙ্কর, ওই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আর যেতে চাই না।”
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার সংগৃহীতব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার এখন পর্যন্ত ক্যারিয়ারে তিনবার ফিফা বিশ্বকাপ খেলেছেন। ২০১৪ সালে ঘরের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা সেমিফাইনালে খেললেও শেষ আটে পাওয়া পিঠের চোটের কারণে মাঠে ছিলেন না এ উইঙ্গার। ঘরের দর্শকদের সামনে শেষ চারে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিলিয়ানরা।
চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কাছে ১-২ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে যায় ব্রাজিল। কাতার বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের যাত্রা থেমে যায় শেষ আটেই।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পরাজয়টি নেইমারকে এতটাই ব্যথিত করেছিল যে দুঃখে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকেই বিদায় বলে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মাথা থেকে সেই চিন্তা বাদ দেন তিনি। নেইমারের ভাবনায় এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করা।
নেইমার বলেন, “সত্যি বলতে বিশ্বকাপের পর আমি আর ব্রাজিল জাতীয় দলে ফিরতে চাইনি। কিন্তু আমার ভাবনায় পরিবর্তন এনেছি। কারণ আমি খুবই ক্ষুধার্ত (বিশ্বকাপের জন্য), তাই না? আমি মন বদলে ফেলেছি।”
পিএসজির এ ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড আরও বলেন, “বিশ্বকাপের পর ফের পরাজয়ের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে চাইনি। আমার পরিবারকে অনেক ভুগতে দেখেছি, যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তবে তাদের আবারও এমনটা সহ্য করতে হবে। এবার ভালো কিছু হবে, হতেই হবে।”