সাগরিকার বাবা: আমার মেয়ে ঠিক ছিল, আমি ভুল

সাগরিকা। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের এক উদীয়মান তারকা। দেশের হয়ে নৈপুণ্যে নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন সব আলো। তবে চা দোকানি বাবার কন্যা হিসেবে দেশের তারকা হওয়ার দৌড়ে উঠে আসার পথটা ছিল ভীষণ কাঁটাঘেরা। 

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের রাঙ্গাটুঙ্গি এলাকায় বসবাস সাগরিকার পরিবারের। এলাকাটির অর্ধেক সীমানা পড়েছে ভারতে। ওই গ্রামের কলেজ শিক্ষক তাজুল ইসলাম ২০১৬ সালে তরুণীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ফুটবল ক্লাব। নাম, রাঙ্গাটুঙ্গি উইমেন ফুটবল ক্লাব। ১০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী তরুণীদের ফুটবলের পাঠ দিতেন তিনি। সেই ক্লাবের মেয়েদের খেলা দূর থেকে দেখতেন সাগরিকা। সেখান থেকেই ফুটবলের প্রতি অনুরাগ। তবে বাধ সাধে পরিবার। বাবা কোনোভাবেই রাজি হননি মেয়ের ফুটবল খেলায় সায় দিতে। তবে সাগরিকা হাল ছাড়ার পাত্রী নন।

সাগরিকার বাবা লিটন আলী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “মেয়েকে ফুটবল খেলার অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত চিন্তা থেকে নয়। বরং প্রতিবেশীরা কিভাবে নেবে বিষয়টি, সেই চিন্তা থেকেই মানা করি।”

নিজের চায়ের দোকানে বসেই মুঠোফোনে তিনি বলেন, “এটা এলাকার সমস্যা ছিল। এলাকাবাসী মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতো। তাই তাকে খেলতে দিতে চাইনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি গরিব মানুষ। আমি ভেবেছি, যদি সে খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকে। আমি তাকে বিয়ে দিতে পারবো না। আমি তার ভবিষ্যতের চিন্তা থেকে তাকে খেলার অনুমতি দেইনি।”

যদিও সাগরিকা তার খেলার অদম্য ইচ্ছা জিইয়ে রেখেছিল। বারবার বাবা-মায়ের কাছে অনুমতি চাইত। এরপর তিনি পাশে পান তার এক খালাকে। তার মাধ্যমে রাজি করান বাবা-মাকে।

এরপর তিনি রাঙ্গাটুঙ্গি উইমেন ফুটবল ক্লাবে যোগ দেন। কোচের নির্দেশনায় নিজের মেধা, দক্ষতা ও পরিশ্রমে নজর কেড়ে নেন সবার। মিডফিল্ডার থেকে স্ট্রাইকারে পরিণত হন। এক বছরের মধ্যে যোগ দেন মূল দলে।

রাঙ্গাটুঙ্গির ছয় নারী ফুটবলারের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পান সাগরিকা। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ে বাবার বেঁকে বসার কারণে সেই প্রতিষ্ঠানও ছাড়তে হয় তাকে। 

ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে সাগরিকার কোচ তাজুল বলেন, “সাগরিকা স্কুলের মতোই পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু বিকেএসপিতে যেভাবে পড়ানো হয় সেটি তো তার গ্রামের স্কুলের মতো নয়। ফলে সে বাদ পড়ে।”

আর তাতে মেয়ের ওপর আস্থা হারান লিটন। তিনি বলেন, “মেয়ে বাড়ি ফেরার পর অন্তত এক মাস আমার সঙ্গে কথা বলেনি। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। তবে এখন বুঝতে পারি, মেয়ে সব সময় ঠিক ছিল। আমি ভুল করেছি। আমি দোষী।”

বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন লিটন। দোকান থেকে টিভিতে নিজের মেয়ের গোল করা দেখেছেন তিনি। তার মতে, “এই দৃশ্য দেখার মতো আনন্দ তিনি আগে পাননি।”

লিটন আর্জেন্টিনার ভক্ত। তিন দশক পর মেসির দল বিশ্বকাপ জিতলেও তার মেয়ের গোলের আনন্দ ছিল আরও অনেক বেশি।

শুক্রবার নেপালের বিপক্ষে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপের বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন সাগরিকা। এছাড়া দুই দিন পর ভারতের বিপক্ষের ম্যাচের জয়েও ছিল তার বড় ভূমিকা। 

লিটন টিভি লাইভে প্রথমবারের মতো সাগরিকার খেলা দেখেছেন। ওই সময় তার দোকানে ভিড় জমে আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। ওই দুই সন্ধ্যাকে নিজের জীবনের অন্যতম দারুণ মুহুর্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “গত রাতে খেলা দেখতে এতো লোকজন জড়ো হয়েছিল যে সবাইকে বসার জায়গা দিতে পারিনি। গোল দেখে তারা সবাই আনন্দ করেছে। আর আমার অনুভূতি হলো, এই গোল বিশ্বের সেরা।”

শেষ ম্যাচের অতিরিক্ত দুই মিনিটের মাথায় ফেবারিটদের বিরুদ্ধে গোল করেন সাগরিকা। বল পেয়ে লম্বা দৌড়ে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ঢুকে গোল করে জয় ছিনিয়ে আনেন। এক ম্যাচ হাতে রেখেই ফাইনালে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। 

লিটন বলেন, “আমার রোজগার স্বল্প। চা দোকানটিই আমি ও আমার স্ত্রীর একমাত্র উপার্জনের জায়গা। দর্শকদের মধ্যে একজন বিজয় উদযাপনে মিষ্টি আনতে ৫০০ টাকা খরচ করেছে।”

তিনি বলেন, “তার ফুটবল খেলার কারণে তাকে আমি বাড়ি থেকেও বের করে দিতে চেয়েছি। কিন্তু আমি এখন বিব্রত। তবে আমি জানি না, পরের বার তার সামনে কিভাবে দাঁড়াবো। আমি খুব লজ্জিত।”

তিনি আরও বলেন, “যারা শুরুতে তার খেলা পছন্দ করেনি। তারাও চিন্তা ধারণা বদলেছে। এখন আমার মেয়ের কারণে মানুষ আমাকে সম্মান করে। এখন আমি তাকে খেলা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিই। ভবিষ্যতে যাতে আরও ভালোভাবে খেলতে পারে, সেজন্য উৎসাহ দেই।”