গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ হয়েছে আগেই, এবার নেশন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের ড্র এবং ফাইনালের পথ স্পষ্ট করে দিল উয়েফা।
শুক্রবার নেশন্স লিগের চলতি মৌসুমের ‘‘রোড টু ফাইনাল’’ নির্ধারণ করে কোয়ার্টার ফাইনালের ড্র অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সম্প্রতি দারুণ ছন্দে থাকা নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে স্পেন। এছাড়া ফ্রান্স ক্রোয়েশিয়ার, জার্মানি ইতালির এবং ডেনমার্কের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল।
দুই লেগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ২০ মার্চ। এর তিন দিন পর দ্বিতীয় লেগের ম্যাচ শেষে সেমি ফাইনালের চার দল নিশ্চিত হবে। এরপর আগামী ৪ ও ৫ জুন সেমি ফাইনাল এবং ৮ জুন ফাইনালের পর শিরোপা উঁচিয়ে ধরবে বিজয়ী দল।
চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সামনে নেদারল্যান্ডস
শিরোপা ধরে রাখতে এবারও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে স্পেনের। কোয়ার্টারে এবার তাদের প্রতিপক্ষ রোনাল্ড কুমানের নেদারল্যান্ডস।
ডাচদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কুমানের অধীনে দারুণ পারফর্ম করে চলেছে দলটি। সবশেষ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সেমি ফাইনালে উঠেছিল ডাচরা। তার আগে গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টারে উঠে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে হারে তারা।
চলতি মৌসুমে নেশন্স লিগেও দারুণ ছন্দে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। হাঙ্গেরি ও জার্মানির মতো দলগুলোর সঙ্গে এক গ্রুপে পড়ে প্রথম ম্যাচেই জার্মানির কাছে হেরে বসে ডাচরা। তবে তারপর অপরাজিত থেকে গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে কুমানের শিষ্যরা।
ফলে সম্প্রতি দুর্দান্ত ছন্দে থাকলেও ডাচ বাধা পেরোনো সহজ হবে না ইউরো ও নেশন্স লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের।
এছাড়া চোটের কারণে বারবার স্কোয়াডে পরিবর্তন এনে দল সাজাতে হচ্ছে লুইস দেলা ফুয়েন্তের। চোট নিয়ে ইতোমধ্যে চলতি মৌসুমের জন্য ছিটকে গেছেন দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় দানি কারভাহাল ও রদ্রি।
তবে তরুণ এবং ফর্মে থাকা স্পেনের যেকোনো ফুটবলারকে জাতীয় দলে ডাক দিয়ে বারবার ফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে দেখা গেছে স্পেন বসকে। ফলে এই দুই দলের লড়াইটা দর্শকের জন্য হবে দর্শনীয়।
ফিরছে ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল
শেষ আটের ড্রয়ে এবার মুখোমুখি হতে চলেছে ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্স। এর ফলে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে, তা-ও একবার নয়, দুবার।
ফ্রান্সের কাছে সেবার ৪-২ গোলে হেরে ক্রোয়েশিয়ার স্বর্ণযুগের খেলোয়াড়দের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। প্রায় পাঁচ বছর পর এবার সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এসেছে ক্রোয়াটদের সামনে।
অবশ্য ভালো পারফর্ম করলেও ক্রোয়েশিয়ার সেই দল এখন আর নেই। বিশ্বকাপ স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই অবসরে চলে গেছেন। তবে এখনও লুকা মদ্রিচ, মার্সেলো ব্রোজোভিচের মতো অভিজ্ঞরা দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সেইসঙ্গে আন্দ্রেই ক্রামারিচ, মাতেও কোভাচিচ, ইয়োস্কো গেভারদিওলের মতো প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার থাকায় গ্রুপ পর্বের চ্যালেঞ্জ উতরে এসেছে জ্লাতকো দালিচের দল।
অপরদিকে, দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় থাকলেও ফর্মহীনতা, চোট ও সমন্বয়ের অভাবে ইউরোর পর থেকেই ধুঁকতে দেখা গেছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যদের। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ইতালির কাছে হারের পর সবশেষ পাঁচ ম্যাচ জিতলেও দলের বড় তারকারা নিজেদের নামের প্রতি এখনও সুবিচার করতে পারেননি। ফলে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ভালো কিছু করতে মুখিয়ে থাকবেন কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলের মতো তারকারা।
গ্রুপের পঞ্চম রাউন্ডের ম্যাচে ইসরায়েলের কাছে ঘরের মাঠে গোলশূন্য ড্র করলেও শেষ ম্যাচে ইতালিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তাদেরই টপকে গ্রুপ সেরা হয়ে কোয়ার্টারে উঠেছে ফ্রান্স।
শেষ চার ম্যাচেই দলের সঙ্গে ছিলেন না এমবাপে। চোটে আক্রান্ত না হলে কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে দলে ফেরাতে পারেন দেশম। ফলে কৌশল দিয়েই দুর্দান্ত এই দলটিকে মাত করতে হবে মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়ার।
ইতালি-জার্মানির হ্যাভিওয়েট লড়াই
ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দিয়েও স্পেনের কাছে হার মানতে বাধ্য হওয়া জার্মানি বিশ্বকাপের পর থেকেই রয়েছে দুর্দান্ত ফর্মে। দলটির খেলোয়াড়রা ক্লাব পর্যায়ে আলো ছড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দলের জার্সিতেও নজর কাড়ছেন। ইউলিয়ান নাগেলসমানের অধীনে খেলোয়াড়দের সমন্বয়ও চোখে পড়ার মতো। যার ফলস্বরূপ নেশন্স লিগে এখনও জার্মানিকে হারানোর অপেক্ষায় প্রতিপক্ষ।
অন্যদিকে, গ্রুপের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে হারলেও আসরজুড়ে দারুণ ছন্দে রয়েছে লুসিয়ানো স্পালেত্তির ইতালি। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতায় মোড়ানো দলটিকে মাঠে নামিয়ে অসাধারণ খেল দেখিয়ে চলেছেন স্পালেত্তি।
সম্প্রতি দলটির মাঠের খেলা দেখে বোঝা যায়, খেলোয়াড় থেকে কোচ, সবাই যেন হারানো ছন্দ খুঁজে পেয়েছে; খুঁজে পেয়েছে তাদের হারানো পরিচয়, খেলোয়াড়ি দর্শন।
তাই শেষ চারে ওঠার প্রতিযোগিতায় এই দুই দলই যে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়াবে, এ বিষয়ে অনেকেই একমত হবেন।
আত্মবিশ্বাসী পর্তুগালের সামনে নিজেদের খুঁজে ফেরা ডেনমার্ক
মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর চারপাশে একগাদা তারকা ফুটবলার থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ ছিল পর্তুগাল। তবে ব্যর্থতার সেই চক্র ভেঙে এবার নিজেদের খুঁজে পেতে শুরু করেছে দলটি।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও রোনালদোর সঙ্গে সমন্বয়ে বহু বছর ধরে সমর্থকরা যা দেখতে চেয়েছেন, তা-ই সম্প্রতি দেখাতে শুরু করেছে পর্তুগাল। এর ধারাবাহিকতায় অপরাজিত থেকে নেশন্স লিগের গ্রুপ পর্ব সম্পন্ন করেছে রবের্তো মার্তিনেসের শিষ্যরা। মাঝে পোল্যান্ডকে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করার মতো কীর্তিও গড়েছে তারা।
শেষ আটে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ডেনমার্ক। তবে ছন্দে না থাকায় ডেনমার্ক বাধা পেরিয়ে সেমি ফাইনালে উঠতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয় তাদের।
সবশেষ ১০ ম্যাচের মাত্র দুটি জিততে পেরেছে ডেনিশরা। সেগুলো নেশন্স লিগের গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ। আর শেষ চার ম্যাচের একটিতেও জয়ের দেখা পায়নি (দুটি করে ড্র ও হার) ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনরা। ফলে এমন ছন্দহীন দলটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া পর্তুগালকে কতটা টক্কর দিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে যায়।
কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে আগামী বছরের জুনে সেমি ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। সেমিতে স্পেন বা নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে বিজয়ী দল। অন্যদিকে, ইতালি অথবা জার্মানির সামনে পড়তে হবে পর্তুগাল-ডেনমার্ক দ্বৈরথে বিজয়ী দলের।
এরপর সেমি ফাইনালের বিজয়ী দুই দল নিয়ে আগামী ৮ জুন ফাইনালের মধ্য দিয়ে এবারের নেশন্স লিগের পর্দা নামবে।