বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক

বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক, যিনি স্পেসএক্স, টেসলা এবং এক্স (সাবেক টুইটার) এর প্রধান।

শুক্রবার (১২ জুন) সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা) পৌঁছায়। 

ট্রিলিয়ন ডলার মানে হলো এক হাজার বিলিয়ন ডলার। ১ সংখ্যার পর ১২টি শূন্য বসালে হয় এক ট্রিলিয়ন। যাকে বাংলায় বলা যেতে পারে এক লাখ কোটি।

বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

রকেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের রেকর্ড গড়া প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) পর ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হন মাস্ক।

এই মাইলফলক বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাসের নতুন যুগ হিসেবে ঘটনাটিকে দেখছেন অনেকে।

মাস্কের নিট সম্পদের পরিমাণ কত?

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি নিট সম্পদ অর্জন করেন বলে জানিয়েছিল ফোর্বস।

তিনি সম্পদের দিক থেকে গুগল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ ও সের্গেই ব্রিন, ওরাকলের ল্যালি এলিসন, অ্যামাজনের জেফ বেজোস এবং ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গের মতো ধনকুবেরদের চেয়েও সামনে এগিয়ে রয়েছেন।

স্পেসএক্স পাবলিক কোম্পানি হওয়ায় তার সম্পদ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলস্বরূপ, ব্লুমবার্গ এবং ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী মাস্কের নিট সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। ব্লুমবার্গের হিসাবে বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ ১.১১ ট্রিলিয়ন।

তবে তার সম্পদের বড় অংশ স্পেসএক্সের শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত, ফলে শেয়ারের দাম কমে গেলে তার ট্রিলিয়নেয়ার মর্যাদা পরিবর্তিত হতে পারে।

টেসলা থেকেও তিনি বিপুল অর্থ পেতে পারেন, যদি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করেন, যার মধ্যে রয়েছে কোম্পানির মূল্য আটগুণ বৃদ্ধি, ১০ লাখ এইআই রোবট বিক্রি এবং ১ কোটি ২০ লাখ টেসলা গাড়ি বিক্রি।

২০২৪ সাল জুড়ে মাস্ক টেসলার কাছ থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের একটি পারিশ্রমিক প্যাকেজ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডেলাওয়্যারের একজন বিচারক দ্বিতীয়বারের মতো তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডেলাওয়্যার সুপ্রিম কোর্ট প্যাকেজটি পুনর্বহাল করে।

বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি তৈরি করলেন কীভাবে?

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পর মাস্ক দ্রুতই তা ছেড়ে দিয়ে ১৯৯০-এর দশকে দুটি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেন।

এর মধ্যে ছিল একটি ওয়েব সফটওয়্যার কোম্পানি এবং একটি অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, যা পরে পেপ্যালে পরিণত হয় এবং ২০০২ সালে ই-বে'র এর কাছে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়।

তিনি সেই অর্থ বিনিয়োগ করেন স্পেসএক্সে যা নাসার তুলনায় কম খরচে বিকল্প তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। একইসঙ্গে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেন টেসলায়, যেখানে তিনি ২০০৮ সালে প্রধান নির্বাহী  হন।এই দুই কোম্পানি আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হলেও তাদের নিজ নিজ শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

ইলন মাস্কের অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে সামাজিক  মাধ্যম টুইটার অধিগ্রহণ।

তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো এক্স-কে একটি ‘সবকিছুর অ্যাপ’ হিসেবে গড়ে তোলা যা বিভিন্ন ধরনের সেবা এক জায়গায় এনে দেবে। তবে বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, মাস্ক যখন কিনেন তখন  কোম্পানিটির মূল্য ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছিল যা এখন ৯.৪ বিলিয়নে নেমেছে।

তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও আগ্রহী। চ্যাটজিপিটি- এর মূল কোম্পানিতে প্রাথমিক বিনিয়োগকারী ছিলেন মাস্ক, তবে ২০১৮ সালে পৃথক হয়ে যান এবং ২০২৩ সালে এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ‘মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা’।

এছাড়া ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ওপেনএইআই এবং এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন, অভিযোগ করেন যে প্রতিষ্ঠানটি তার অলাভজনক ও ওপেন সোর্স ভিত্তি থেকে সরে গেছে। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার এক জুরি তার মামলা খারিজ করে দেয়।

সাংবাদিক ক্রিস স্টকেল ওয়াকার বলেন, “আমি কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি না যে তিনি আগামীকাল কী করতে চান তা জানেন। তিনি মূলত অন্তর্দৃষ্টির ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যান।”

২০১৫ সালের একটি জীবনীতে লেখক অ্যাশলি ভ্যান্স তাকে ‘বিতর্কপ্রবণ সবজান্তা’ এবং ‘প্রচুর অহংবোধসম্পন্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

গণমাধ্যমে তাকে কখনও ‘উন্মাদ প্রতিভা’, কখনও ‘এক্স-এর বড় ট্রোল’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২২ সালে টেড-এ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “যদি আমার পাপগুলো তালিকাভুক্ত করেন, তাহলে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ মনে হব। কিন্তু আমি যা ভালো কাজ করেছি সেগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে, এগুলোকে অনেক বেশি অর্থবহ মনে হয়।”