বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটার এখন চীনের

বিশ্বব্যাপী সুপারকম্পিউটারের র‌্যাঙ্কিং ‘টপ ৫০০’ এ যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিটান’ কে পেছনে ফেলে শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে চীনের ‘লাইনশাইন’ কম্পিউটার।

চীনের শেনঝেন শহরের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে অবস্থিত ‘লাইনশাইন’ ২.১৯৮ এক্সাফ্লপস পারফরম্যান্স অর্জন করেছে। অর্থাৎ, এটি প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নের বেশি হিসাব-নিকাশ করতে সক্ষম। এই গতি যুক্তরাষ্ট্রের এল ক্যাপিটানের চেয়ে ২০% বেশি। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।   

২০১৭ সালে ‘সানওয়ে তাইহুলাইট’- এর পর এই প্রথম কোনো চীনা সুপারকম্পিউটার সিস্টেম এই তালিকার শীর্ষে উঠেছে।  

নতুন তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘ফ্রন্টিয়ার’। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইলিনয়ের আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘অরোরা’ এবং জার্মানির জুলিখ সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের ‘জুপিটার’।

শীর্ষ ২০-এর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড। 

‘টপ ৫০০’ তালিকার অন্যতম আয়োজক এবং টেনেসি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডংগারা জানান, সবচেয়ে উন্নত চিপের ওপর মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও ‘লাইনশাইন’ - এর এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে চীন উন্নত কম্পিউটিংয়ে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম। 

ডংগারা বলেন, “রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে কিছু উন্নত যন্ত্রাংশ পেতে চীনের হয়তো দেরি হচ্ছে, কিন্তু এটি তাদের নিজস্ব দেশীয় বিকল্প তৈরি করতে জোরালোভাবে উৎসাহিত করছে।”

কীভাবে কাজ করে লাইনশাইন?

সাধারণত সিপিইউতে প্রসেসিং কোর কম থাকে এবং চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল চালানোর জন্য এগুলো গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ-এর চেয়ে ধীরগতির হয়।

টপ ৫০০-এর তালিকার তথ্যমতে, লাইনশাইনই প্রথম এবং একমাত্র সিস্টেম, যা শুধু সিপিইউ ডিজাইন ব্যবহার করে ২ এক্সাফ্লপসের বেশি পারফরম্যান্স অর্জন করতে পেরেছে।

র‍্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব

কয়েক দশক ধরে ‘টপ ৫০০’ তালিকা বেশ প্রভাবশালী হলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন এআই আসার পর কম্পিউটিং প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার কারণে এই র‍্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।

বর্তমানে মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো করপোরেট প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এআইয়ের অগ্রগতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। অথচ এই তালিকায় মূলত সরকারি ও একাডেমিক উদ্যোগে তৈরি সুপারকম্পিউটার জায়গা পেয়েছে। 

২০১৫ সালের এক গবেষণাপত্রে কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দাবি করেছিলেন, এল ক্যাপিতান আসলে ‘এক্সএআই’ এর কলোসাস সুপারকম্পিউটিং-এর মাত্র ২২% গণনাক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে।

অধ্যাপক ডংগারা বলেন, “এই তালিকা কেবল একটি বেঞ্চমার্কের ওপর ভিত্তি করে পারফরম্যান্স পরিমাপ করে, তাই একে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের সম্পূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের ক্ষমতা, জ্বালানি সাশ্রয়, সফটওয়্যারের মান, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহারের সহজতা এবং বৃহৎ একটি গবেষক সম্প্রদায়কে সাহায্য করার ক্ষমতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

কম্পিউটিং শিল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারসেক্ট ৩৬০ রিসার্চ’ এর সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল জানান, লাইনশাইনের সক্ষমতা নিয়ে তিনি অবাক হননি। তবে চীনা ডেভেলপাররা যে আবারও এই র‍্যাঙ্কিংয়ে অংশ নেওয়া শুরু করেছে, সেটাই সবচেয়ে লক্ষণীয়।

এআইয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন তীব্র লড়াইয়ে মেতেছে।

গত এপ্রিলে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ‘২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এআই মডেল পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান 'কার্যত কমিয়ে এনেছে' চীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বেশি উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে, সেখানে পেটেন্ট তৈরি এবং শিল্পক্ষেত্রে রোবট স্থাপনের দিক থেকে চীন এগিয়ে রয়েছে।