Tuesday, October 20, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

উত্তরের জেলাগুলোতে কমছে পানি, মধ্যাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

বন্যার পানি নামছে, জেগে উঠছে ক্ষত

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৪ পিএম

বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলো থেকে বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করেছে। তবে মধ্যাঞ্চলে এখন বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আত্রাই নদী অববাহিকার এলাকাগুলো নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্ক দেখা দিয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভারি বৃষ্টির কারণে এই বন্যা বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবন্ধা ও চাপাইনবাবগঞ্জে বন্যার পানি কমেছে৷  তবে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, মানিকগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হতে পারে। নওগাঁ এবং আত্রাই নদী সংলগ্ন এলাকাও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপদে তিস্তা পাড়ের মানুষ

এদিকে এই বন্যায় রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলার মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর পশ্চিম পাশে সেতু রক্ষা বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকা ধসে পড়ছে। এতে প্রায় ৭০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত বাঁধের গায়ে সরাসরি আঘাত করায় এ ধস দেখা দিয়েছে।

এই ধসে লালমনিরহাট-রংপুর সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি আশপাশের অন্তত তিনটি গ্রামের এক হাজারেরও বেশি পরিবারের বসতভিটা ও কৃষিজমি সরাসরি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা দ্রুত মেরামত না হলে বাঁধের সঙ্গে সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেবে।

গঙ্গাচড়া এলাকার বাসিন্দা নির্মল রায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তিস্তা নদী নীলফামারি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা হয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে। ফলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার উপরে চলে গেলে ওই চারটি জেলার মানুষই ক্ষতির মুখে পড়ে, প্লাবিত হয়।”

তিনি বলেন, “তিনদিন পর এখন পানি নেমে যাচ্ছে। তবে অনেক পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সেইসঙ্গে সেতুরক্ষা বাঁধটি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ব্লক বসে গেছে। যদি এটা ভেঙ্গে যায় তাহলে পুরো জেলা প্লাবিত হবে। সমস্যা  হচ্ছে এই বাঁধটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)৷ ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বলেও কোনো কাজ হয় না। আমরা স্থানীয়রা ব্লক ফেলে রক্ষার চেষ্টা করছি।”

তার আশঙ্কা সেতু রক্ষা বাঁধটি ভেগে গেলে রংপুর থেকে লালমনিরহাটের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে৷

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “সেতু রক্ষা বাঁধটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ তবে ওটা এলজিইডি নির্মাণ করেছে। ওটার দায়িত্ব তাদের। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।”

তিনি বলেন, “পানি নেমে যাচ্ছে। তিস্তার পানিও বিপৎসীমার নীচে চলে গেছে। বন্যায় বেশ কিছু বাড়ি-ঘরের ক্ষতি হয়েছে। আমি গঙ্গাচড়া এলাকায় শনিবার গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছি।”

তবে এনিয়ে যোগাযোগ করে এলজিইডির কারো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ

লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা এলাকার বন্যার পনিও নামছে। তবে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি নামতে শুরু করায় রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৪ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধ ও  সেতু রক্ষা বাঁধ। কিন্তু এই বেড়িবাঁধগুলো প্রশ্নের মুখে। গত জুন মাসে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া নদীর তীরের ১২২ কিলোমিটার বাঁধের ২০টি জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে হু হু করে পানি ঢুকে পড়ে। তাতে তিনটি উপজেলার অনেক গ্রামই পানির নীচে তলিয়ে যায়। পানির তোড়ে অনেকের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, খামার, ফসল সব কিছু ভেসে যায়। কমপক্ষে ৪০টি গ্রাম পানির নীচে চলে যায়। তখন ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, “বাংলাদেশে সব মিলিয়ে যে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটারের মতো বাঁধ আছে এগুলোর ডিজাইন এবং এর নির্মাণ উপকরণে সমস্যা আছে। ফলে যখন পানির ওয়েভ আসে সেগুলো টেকে না। আর এগুলো হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।”

এ নিয়ে চেষ্টা করেও দুর্যোগ ব্যবস্থপনা অধিদপ্তরের কোনো কর্মকতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কতা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান শনিবার (১৬ আগস্ট) ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এখন একটি নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নওগাঁর আত্রাই নদী। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তা বিপৎসীমার ওপরেই থাকবে। এরপর পানি কমতে পারে। নওগাঁ জেলায় স্বল্প মেয়াদি বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। পদ্মা নদীর পানি আরও দুইদিন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এরফলে পদ্মা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলো  প্লাবিত হবে।” এতে যমুনা নদী সংলগ্ন এলাকা টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, গাইবান্ধা, কুঁড়িগ্রাম ও পাবনা এলাকায়ও পানি বাড়তে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র শনিবার জানিয়েছে, আত্রাই নদী আত্রাই রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে (নওগাঁ) বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আত্রাই নদী নওগাঁয় বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করতে পারে ও নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হতে পারে।

পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এই সময়ে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, মানিকগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।

যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে ও সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। শুক্রবার দেশের অভ্যন্তরে চট্টগ্রাম বিভাগে এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশের অভ্যন্তরে সিলেট ও রংপুর বিভাগে এবং উজানে মাঝারি-ভারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীসমূহের পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ ঘন্টা ওই নদীসমূহের পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে, এই সময়ে আত্রাই নদী নওগাঁয় বিপৎসীমার উপরে অবস্থান করতে পারে ও নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হতে পারে। পরবর্তী দুই দিন নদীসমূহের পানি হ্রাস পেতে পারে।

গঙ্গা নদীর পানি গত হ্রাস পেয়েছে, অপরদিকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গঙ্গার পানি আগামী পাঁচ দিন হ্রাস পেতে পারে। পদ্মা নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, মানিকগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও ঢাকা জেলার উক্ত নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহ সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। তবে পরবর্তী চার দিন পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল গত ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল আছে, অপরদিকে যমুনা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে ও পরবর্তী দুই দিন হ্রাস পেতে পারে। যমুনা নদীর পানি সমতল আগামী ২৪ ঘন্টা বৃদ্ধি পেতে পারে ও সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে।

সিলেট বিভাগের কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল গত ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে সুরমা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে। ওই নদীসমূহের পানি সমতল আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। মনু, ধলাই, খোয়াই নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে ও পরবর্তী দুই দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে।

রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতলে হ্রাস পেয়েছে। আগামী দুইদিন তিস্তা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে ও ধরলা, দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে; তবে তৃতীয় দিন ওই নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের ত্রিপুরায় প্রবল বৃষ্টি হয়েছে৷ দেশের অভ্যন্তরেও বৃষ্টি হয়েছে, তাই নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। তবে বড় বন্যার আশঙ্কা কেটে গেছে।

তিনি বলেন, “আরও কিছু জেলা অল্প সময়ের জন্য প্লাবিত হবে। মাঝারি ও হালকা বৃষ্টিপাত হবে। সামনে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই।”

তবে বন্যার পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। কেথাও বাঁধ ভেঙে গেছে এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

   

About

Popular Links

x