গাজীপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি এবং নৃশংসতার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও সহিংসতায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বন্ধ হয়নি। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও, অপরাধ প্রবণতা হ্রাসের ব্যাপারে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না বলে জানান বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, কোন দিকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
এর মধ্যে গত সাড়ে চার মাসে (জানুয়ারি-১৬ মে) ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও এগুলোকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি বলতে নারাজ পুলিশ। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, একের পর এক এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকাবাসী পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সাধারণ জনগণ বলছেন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে। পুলিশ টহল বৃদ্ধি ও প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।
শনিবার (১৬ মে) দুপুর ২টার দিকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোড়দৌড় পদ্মা নদীতে ভাসমান অবস্থায় অভিযুক্ত ও নিহত নারীর স্বামী ফোরকান মিয়ার (৪০) লাশ উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। গত ৯ মে কাপাসিয়া উপজেলার রাওতকোনা গ্রামে এক পরিবারের নারী, তার তিন মেয়ে এবং ভাইসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি (উত্তরপাড়া) বগার ভিটা এলাকার গজারি বনের ভিতর থেকে অটোরিক্সা চালক আসিফ হোসেনের (২১) গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে স্ত্রীর সঙ্গে দুপুরের খাবার শেষে বিকেল ৫টার দিকে বাড়ি থেকে অটোরিক্সা নিয়ে বের হয় আসিফ। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে নিহতের শ্যালক জিসান বাড়ির পাশে রাজাবাড়ী-শ্রীপুর সড়কের পূর্ব পাশে গজারি বনের ভেতর নিচু জমিতে আসিফের গলাকাটা মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
মঙ্গলবার (১২ মে) ভোরে শুভ নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার (১১ মে) রাতে মহানগরীর গাছা থানাধীন উজারপাড়া মহরের বাড়ি এলাকায় অটোরিক্সা চালক শুভকে (১৬) গলা কেটে হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
সোমবার (১১ মে) গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই দিন চিকিৎসাধীন থেকে জয়নাল মোকামির (৬২) মৃত্যু হয়েছে। ৯ মে সন্ধ্যায় শ্রীপুরের প্রহলাদপুরে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জয়নাল মোকামিকে সালিশ বৈঠকে ডেকে ইউপির সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে আহত করা হয়। নিহত জয়নাল মোকামি প্রহ্লাদপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন।
রবিবার (১০ মে) ভোরে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা বাজার এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন সিলেট সদর উপজেলার ঘাসিটোলার কৃষাণ (৪৬), জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের বদনী ভাংনা গ্রামের আজহারুল ইসলাম (৩৬) এবং রাজধানীর মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগ এলাকার সেলিম (৩৮)। পুলিশ জানিয়েছে নিহত ব্যক্তিরা পেশাদার গরুচোর ও ডাকাত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা আছে। তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। দুই মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০০ জনকে আসামি করা হয়। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
একই দিন দুপুরে কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক মধ্যবয়সী পুরুষের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কচুরিপানার সঙ্গে নদীতে লাশটি ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা ওই ব্যক্তিকে কয়েক দিন আগে কে বা কারা হত্যা করে লাশটি নদীতে ফেলে দিতে পারে। পরবর্তীতে পানিতে দীর্ঘ সময় থাকায় লাশটি ফুলে ভেসে ওঠে।
রবিবার (৩ মে) গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের পূর্বপাড়া এলাকা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে কোনাবাড়ী থানা পুলিশ। নিহত মমতাজ খাতুন (২২) কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কাজাইকাটা গ্রামের ময়নাল হকের মেয়ে। তিনি স্বামী ও শাশুড়ির সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করে স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) ভোরে টঙ্গী পূর্ব থানার উত্তর বনমালা এলাকায় নিজ ঘর থেকে ছেলে সাকিবুর রহমান (১৮) এবং বাড়ির কাছে রেললাইনের পাশ থেকে বাবা সোহেল রানার (৫০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। খালাতো বোনের সঙ্গে প্রেমের জেরে মুখ চেপে ধরে এবং হাত-পা বেঁধে ধারালো ব্লেড দিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে প্রথমে ছোট ভাইকে খুন করে। ঘটনা দেখে ফেলায় বাবাকে খুন করে বড় ভাই সাইফুর রহমান সোহান (২৮)।
একই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের মেঘডুবি এমএম নিয়াজ উদ্দিন স্কুলের পাশের একটি বাড়ির নিজ কক্ষ থেকে কুলসুম বেগম (৪৫) নামে এক নারীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত কুলসুম বেগম ওই এলাকার মৃত আতাব উদ্দিনের মেয়ে। ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করেছে নিহতের পরিবার।
শনিবার (১১ এপ্রিল) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শ্রীপুর পৌরসভার বেড়াইদেরচালা (জংলাপাড়া) এলাকার মাসুদ মিয়ার বাড়ি থেকে ঝরনা আক্তার (১৬) নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রীকে হত্যার পর প্রতিবেশীকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধার করতে বলেন স্বামী তাকওয়া পরিবহনে মিনিবাস চালক অপু।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত ২টার দিকে গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের পিরুজালী (মধ্যপাড়া) গ্রামে শ্বাশুড়ি আসমা আক্তারকে (৫৫) গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে পূত্রবধূ আরিফা আক্তারের (২৬)।
শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে শ্রীপুর পৌরসভার চন্নাপাড়া এলাকার নাজমুল হাসানের বাড়ির পাশের ডোবা থেকে অজ্ঞাত পরিচয় নারীর তিন খণ্ড মরদেহ করে পুলিশ। সকাল থেকেই এলাকায় উৎকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে ডোবায় কচুরিপানার ভেতর মিললো নারীর খণ্ডিত মরদেহ। অন্য কোথাও ওই নারীকে হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীরের অংশগুলো ডোবায় ফেলে রাখা হয়েছে দাবি পুলিশের।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের খলাপাড়া গ্রামে ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ এবং সিকদার ওয়ার্কশপের মালিকের মধ্যে মেশিনের ফর্মা তৈরি নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়। ওয়ার্কশপ মালিকের বিরোধের জেরে সংঘর্ষে হাবিবুর রহমান হবি সিকদার (৭০) নিহত হয়েছেন।
বুধবার (৪ মার্চ) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরের পূর্ব ধীরাশ্রম এলাকা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর জেলা শাখার সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান মোল্লার (৬৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দুর্বৃত্তরা তাকে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করে ধীরাশ্রম এলাকার একটি সড়কের পাশে মরদেহ ফেলে পালিয়ে যায়। পাশাপাশি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) গাজীপুরের জয়দেবপুরে বাবার কাছে নালিশ দিতে চাওয়ায় ছোট ভাইকে হত্যা করে আপন বড় ভাই আলামিন হোসেন। বাবার কাছে মোবাইল কেনার বায়না ধরে মাদ্রাসা ছাত্র আব্দুর রাহিম (১৩)। বড় ভাই আলামিন হোসেন বিষয়টি দেখে ছোট ভাই আব্দুর রাহিমকে ভয় দেখানোর জন্য বাড়ির অদূরে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মাফলার দিয়ে গজারী গাছের সঙ্গে বাঁধেন এবং মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেন। এরপর রাহিমকে চর-থাপ্পড় মেরে মুখের স্কচটেপ খুলে দিলে রাহিম পুরো ঘটনা তার বাবাকে বলে দিবে বললে আলামিন ছোট ভাই রাহিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের শৈলাট গ্রামের জুট মিল শ্রমিক বিল্লাল হোসেন (৪০) মারা যান। এর আগে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে পরকিয়া সন্দেহে স্বামী জানু মিয়া ওপর টিমেক্স জুটমিল কারখানার সামনে হাতুড়ি দিয়ে বিল্লাল হোসেনের ওপর হামলার করে।
পুলিশের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় আইন হাতে তুলে নেয় স্থানীয়রা
এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় লোকজন। কালিয়াকৈরের ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামের আবুবকর সিদ্দিক বলেন, “ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গরু চুরি, ছিনতাই ও মাদকসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। এসব ঘটনায় পুলিশ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছিল। গ্রামবাসী গত কয়েকদিন ধরে রাতে বিভিন্ন স্থানে পাঁচজনের একটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে ডাকাতদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ যদি কার্যকর পদক্ষেপ নিতো তাহলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতো না।”
একই ইউনিয়নের সলংগা গ্রামের আব্দুল জব্বার বলেন, “কোনো ঘটনা ঘটনার পর অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনলে এসব ঘটনা ঘটতো না।”
ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মফিজ উদ্দিন মোল্লা বলেন, “মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। কথায় কথায় হত্যা ও খুনোখুনিতে জড়াচ্ছে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলতে নারাজ পুলিশ
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কালিয়াকৈর থানার ফুলবাড়ীয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বলেন, “জনবল কম থাকায় যথা সময়ে সব এলাকায় টহল দেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে টহল জোরদার করা হয়েছে। আগের চেয়ে চুরি ও ছিনতাই অনেকটাই কমে এসেছে।”
তবে এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলতে নারাজ গাজীপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) খন্দকার আশফাক উজ্জামান।
তিনি বলেন, “কালিয়াকৈরের ঘটনায় চুরি করতে গিয়েছিল। মানুষ তাদের এলাকা পাহারা দেয়। ওই এলাকায় পুলিশের দুটি টিমের পাশাপাশি টহল টিমও কাজ করে। তবু মানুষের ক্ষোভ থামানো যায় না। মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। আইনত যেটা হওয়ার কথা, আমরা সেটা দেখবো। আর কাপাসিয়ার ঘটনা পারিবারিক। ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কনসার্ন হওয়ার মতো একদমই না। সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে, এটি আমরা বলছি না।”
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) শরিফ উদ্দিন বলেন, “কাপাসিয়ার ঘটনা পারিবারিক। অন্য ঘটনাগুলো সহিংসতা। আর এসব ঘটনায় পুলিশ পদক্ষেপ নিচ্ছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”



