রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম ঘটনায় তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিতের দাবিতে রাজধানীজুড়ে চলছে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি ও বিক্ষোভ। এর মধ্যেই ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তারপরও সাধারণ মানুষের মন থেকে শঙ্কা কাটছে না। বিগত দুই দশকের অপরাধের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেকেই রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার প্রাপ্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন। কারণ, দেশে এমন বহু আলোচিত ও স্পর্শকাতর অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে, এমনকি চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হতেও কেটে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। মিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে চাঁদপুরের বিতর্কিত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর অপরাধের খতিয়ান ও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রসু খাঁ একাই ১১ জন নারীকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগে, ২০১৫ সালে একটি মামলায় নিম্ন আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তাঁর সেই ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়।
হাইকোর্ট তাদের রায়ের পর্যবেক্ষণে রসু খাঁকে একজন চরম নৃশংস 'সিরিয়াল কিলার' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আদালত স্পষ্ট জানান, এই অপরাধী কোনো ধরনের আইনি অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন এবং সর্বোচ্চ শাস্তিই তার একমাত্র প্রাপ্য। অথচ হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী রায়ের পর আরও প্রায় দুই বছর সময় পার হয়ে গেলেও এখনো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে থমকে আছে আইনি প্রক্রিয়া এবং কার্যকর করা সম্ভব হয়নি তার মৃত্যুদণ্ড।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা এই পরিস্থিতির জন্য বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের জটিলতাকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ ও মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সামগ্রিক বিচার প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। রসু খাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় নিম্ন আদালত কিংবা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা হলেও উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কনডেম সেলে দিন কাটছে এই আসামির।
তবে এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আপিল বিভাগে রসু খাঁর মামলার শুনানি শেষ করে রায় বাস্তবায়নের পথে এগোনো সম্ভব হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের সংবেদনশীল অপরাধের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩%। এর বিপরীতে তথ্য ও প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭০% মামলার আসামিরা শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। যদিও আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই ধরনের মামলা নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে নিম্ন আদালতেই একটি মামলার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ হতে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।



