Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সাভারে শিল্প নগরীতে ঢুকেছে ৪০ হাজারের বেশি কাঁচা চামড়া

শিল্প নগরী সংলগ্ন চামড়ার আড়তগুলোতে কম দর নিয়ে আক্ষেপ মৌসুমি বিক্রেতাদের

আপডেট : ২৮ মে ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

ঈদ-উল-আজহার প্রথম দিনে ঢাকার সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে ঢুকতে শুরু করেছে কাঁচা চামড়া।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকেল ৬টা পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজারের বেশি কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেছে।

সরেজমিনে চামড়া শিল্প নগরীতে গিয়ে সন্ধ্যা ৭টা অব্দি শিল্প নগরীতে চামড়া প্রবেশ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায়নি। ঈদের বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি শিল্প নগরীতে চামড়া প্রবেশ ও সঠিকভাবে এর সংরক্ষণ নিশ্চিতে বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বয় করে যৌথভাবে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দুই দিনে আরও বাড়বে চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ।

চামড়া শিল্প নগরীর বিসিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাইয়ান জানান, বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত মোট ১৯২টি ট্রাকে করে শিল্প নগরীতে এসেছে ৪৩,৮৬৭টি কাঁচা চামড়া। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া রয়েছে ৪৩,৫১৪টি এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া ৩৫৩টি। শিল্পনগরীতে আসা চামড়া দ্রুত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতের কাজ চলছে। এছাড়া চামড়া পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় সার্বিক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চামড়া প্রবেশের এই পরিমাণ আরও বাড়বে, পাশাপাশি সার্বিক ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে।

শিল্প নগরীর প্রধান ফটকে দায়িত্বপালনরত কর্মীরা জানান, বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ সর্বপ্রথম কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে একটি গাড়ি শিল্প নগরীতে প্রবেশ করে।

মূলত দিনের প্রথম ধাপে আসা এসব চামড়ার সিংহভাগই রক্তমাখা কাঁচা চামড়া। আড়ত ও ট্যানারিতে চামড়াগুলো প্রবেশের পর তাতে লবণ মাখানোর কাজ করছেন শ্রমিকরা।

অন্যদিকে, বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাসহ শিল্প নগরীতে অবস্থিত ট্যানারিগুলোতে চামড়া নিয়ে আসা বিভিন্ন মৌসুমি ব্যাবসায়ীদের চামড়ার দর নিয়ে কোনো আপত্তি না পাওয়া গেলেও শিল্প নগরী সংলগ্ন চামড়ার আড়তগুলোতে চামড়া নিয়ে আসা ব্যক্তিরা দর নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ী এসময় দাবি করেন, সরকার নির্ধারিত দাম অনুপাতে রক্তমাখা কাঁচা চামড়ার দাম যতটা হওয়া প্রয়োজন, সেই অনুপাতে অনেক কম দাম প্রস্তাব করছেন আড়তদাররা।

তবে ট্যানারিগুলোতে চামড়া নিয়ে আসা বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তের তুলনায় ট্যানারিতে তারা ভালো দর পাচ্ছেন। আবার যেসব ট্যানারির সঙ্গে তাদের পূর্ব সম্পর্ক রয়েছে, সেখানে তারা এই মুহূর্তে দাম নিয়ে আলোচনা ছাড়াই চামড়া লবণজাত করার জন্য রেখে যাচ্ছেন। কিছুদিন পর ট্যানারি কর্তৃপক্ষের ডাক পেলে এসে দরদাম করে দাম নির্ধারণ করবেন তারা। তবে এক্ষেত্রে যারা এই পদ্ধতিতে ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি করেন, তাদের দাবি ট্যানারিতে দর নিয়ে তাদের খুব বেশি জটিলতা পোহাতে হয় না।

পরেশ নামে বলিয়ারপুর এলাকা থেকে ৩০টি চামড়া নিয়ে আড়তে বিক্রি করতে আসা একজন মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, “৭০০ টাকা দরে যেই চামড়া কিনেছি, সেই চামড়ার দর আড়তে ৬০০ টাকা বলছে। লাভ তো দূরে থাক, এমন হলে তো গাড়ি ভাড়াও পকেট থেকে যাবে।”

একইভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করে টঙ্গীর গাজিপুরা এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে ২০০টি চামড়া নিয়ে আসা আরেকজন ব্যক্তি বলেন, “আড়তে চামড়ার দাম অনেক কম বলছে। যার কারণে ট্যানারির ভেতরে চামড়া নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি ট্যানারিতে কিছুটা ভালো দাম পাওয়া যাবে কারণ আড়তের লোকজন তো ট্যানারিতেই বিক্রি করে।”

অভিযোগের আংশিক সত্যতার কথা স্বীকার করে হেমায়েতপুরের চামড়ার আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, “সমস্যা হচ্ছে অর্থসংকট। আমাদের প্রচুর টাকা ট্যানারিগুলোতে বাকি পড়ে আছে। নগদ প্রবাহ কম থাকায় এবং যেহেতু আমরা লোন ফ্যাসিলিটিও পাই না, কাজেই চামড়া বেশি এসে পড়লে দেখা যায় কিনতে সমস্যা হয়ে যায়। তবে মোটাদাগে আমরা সবসময় চেষ্টা করি সরকার নির্ধারিত মূল্যের অনুপাতেই দাম দেওয়ার। আবার চামড়ার সাইজ এবং মানও নির্ভর করে দর বিবেচনার ক্ষেত্রে।”

অন্যদিকে ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রির বছরের সেরা এই মৌসুমে চামড়া কেনার ক্ষেত্রে যেই ধরনের আগ্রহ ট্যানারি মালিকদের থাকার কথা, সেই আগ্রহেও ভাটা চলছে গত বেশ কয়েকবছরের মতো এবারও। মূলত চামড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্রমাগত দরপতন, এলডাব্লিউজি সনদের অভাবে চীন নির্ভরতাই এর পেছনের অন্যতম কারণ।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন, একসময় এই সময়ে চামড়া কেনার ক্ষেত্রে যেই ধরনের উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি হতো, এখন সেটি নেই। ব্যাবসায় মন্দা, ক্রমাগত দরপতন, রপ্তানির ক্ষেত্রে এককভাবে চীন নির্ভরতা এবং লোকসান, সব মিলিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে বড় অংকের লোকসান গুনেছেন। আবার লোকসানের মুখে পড়ে ঋণখেলাপিও হয়েছেন অনেকে।

আজমীর লেদারের মালিক মো. শহিদুল্লাহ বলেন, “এই দফায় ২০ হাজার পিস চামড়া কেনার লক্ষ্য রয়েছে আমাদের। ইতোমধ্যে ৫ হাজারের মতো চামড়া চলে এসেছে। মূলত আমাদের সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের সূত্রে যারা চামড়া নিয়ে আসছেন, তাদের চামড়াগুলোই কিনছি। কেননা এখনও আমার কারখানায় ৫০ হাজার পিসের উপরে চামড়া স্টকে রয়েছে। ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো হলে সেটি সকলেই জন্যই কল্যাণকর হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনকি অনেক ব্যবসায়ী আছে যাদের মূলধন ইতোমধ্যে অর্ধেক হয়ে গেছে।”

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক ও সমতা লেদারের মালিক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “এ বছর কমবেশি ১ কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য আমাদের রয়েছে। এছাড়াও এখন পর্যন্ত মার্কেট পরিস্থিতিও ভালো রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ভলিউম বেচাকেনাটা রাতে হওয়ার কারণে, দিনের বেলা যেভাবে একটা চামড়া দেখে নেওয়া যায়, রাতে তো সেটা পারা যায় না। ফলে তখন দর কম হলে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। এবারও ভলিউম বেচাকেনা রাতেই হবে। তবে এখন পর্যন্ত মার্কেট পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।“

   

About

Popular Links

x