Thursday, June 25, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এনাম মেডিকেল: সই জালিয়াতিতে চাকরিচ্যুত ২ চিকিৎসককে পুনর্বহালের দাবি

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মবিরতি পালন করছেন চিকিৎসকদের একাংশ

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

ঢাকার সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন হয়রানির কারণে এ কর্মসূচি পালন করছেন তারা। 

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে মানববন্ধন থেকে আয়োজকরা সম্প্রতি সই জালিয়াতির দায়ে চাকরিচ্যুত ২ চিকিৎসকের বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল ও তাদের পক্ষে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশপ্রাপ্ত অপর এক চিকিৎসককে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি করেন। এছাড়াও এ শাস্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। 

যদিও এ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া অনেকেই ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। আবার কেউ কেউ কর্মসূচির কারণ বলতে পারেননি। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। 

এদিকে চিকিৎসকদের কর্মসূচিতে দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। বলছেন, রোগীদের জিম্মি করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের। 

ঘটনার শুরু যেভাবে

গেল ৫ মে উর্মি আক্তার নামে এক রোগীর একটি মেডিকেল পরীক্ষার স্লিপে কমিশনে অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ বিভাগ বরাবর পাঠান এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. সজীব ঘরামী। ওই স্লিপে এনাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুর রহমানের সিল ও সই যুক্ত করা হয়। 

তবে স্লিপটিতে গড়মিলের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ সেটি বাতিল করে। এরপর ৭ মে সেটি আবার অর্থ বিভাগে পাঠান একই বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. ফয়সাল আহমেদ। এটিও বাতিল করে স্লিপটি হাসপাতালের পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়। সেখানেই প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, স্লিপে থাকা সই ও তারিখের দিনে প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আতিকুর রহমান ছুটিতে ছিলেন। এ ঘটনায় গত ১৩ মে অভিযুক্ত ২ চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

এরপর, ১৬ মে ওই নোটিশের জবাবে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে অধ্যক্ষ বরাবর আবেদন দেন উভয় চিকিৎসক। এরপর ১৭ মে এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন কলেজের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানকে। ২৪ মে ৭ সদস্যের শৃঙ্খলা কমিটি অভিযুক্ত ২ চিকিৎসককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে সই জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ পাওয়া ও নৈতিকতার অবক্ষয় প্রতীয়মান হওয়ায় গত ৬ জুন এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মোতাহার হোসেন ভূঁইয়ার সাক্ষরিত আদেশে ডা. সজীব ঘরামী ও ডা. ফয়সাল আহমেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। 

এর একদিন পর ওই ২ চিকিৎসক অধ্যক্ষের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। তবে সে আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এনাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। 

এদিকে, এ ঘটনার পর হাসপাতালের এনেস্থিসিয়া বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া দুই চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রভাষকদের নিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে এই শাস্তি সঠিক হয়নি উল্লেখ করে অসদাচরণ করেন। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হাসপাতালের পরিচালককে নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে ডা. রফিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। 

এদিকে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৭ দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে কর্মবিরতি ও মানববন্ধন করেন চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাংশ। 

তারা শাস্তিপ্রাপ্ত দুই চিকিৎসককে বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল, ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে দেওয়া নোটিশ প্রত্যাহার ও নোটিশদাতার জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানসহ একাধিক পরিচালককে অব্যাহতি, চিকিৎসকদের সার্ভিস রুল প্রণয়ন ও ইন্টার্ন-জুনিয়র চিকিৎসকদের নানা অজুহাতে বেতন কর্তনের বিরুদ্ধে দাবি করেন। 

কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া কর্মসূচিতে দাবিগুলো তুলে ধরেন। তিনি দাবি করে বলেন, “আমরা তাদের কোনো কিছুর প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। দুইজন চিকিৎসককে অব্যাহতি দেওয়ায় তাদের সঙ্গে কথা বলি। নিয়ম মানার কথা বলি। একটা নোটিশ দিয়ে চাকরিচ্যুত করতে পারে না। শাস্তি হতে হবে সঠিক নিয়মে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে শোকজ করে। এও বলা হয়, আমি নাকি দলবল নিয়ে বিশৃঙ্খলা করেছি প্রিন্সিপালের রুমে। আমরা মানববন্ধন ও কর্মসূচি করছি। আমরা সবাই এখানে এসেছি। কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজে ফিরিয়ে নিক।” 

প্রায় অর্ধ শতাধিক চিকিৎসক এ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও সামনের সারিতে থাকা এক দেড় ডজন চিকিৎসক ছাড়া বাকি বেশিরভাগ চিকিৎসকই ছিলেন ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসক। 

এরমধ্যে অনেকেই এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণ বলতে পারেননি। কেউ কেউ সাংবাদিকের ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান, কেউ কেউ জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। মূল জমায়েতের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নারী চিকিৎসকদের কেউই বক্তব্য দিতে রাজি হননি। 

এ সময় কর্মসূচিতে থাকা চিকিৎসকদের দুইজন বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনার ছবি ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তারা। 

বেলা সাড়ে ১০টার দিকে তারা জমায়েতসহ অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তারা প্রায় আধা ঘণ্টা পর অবস্থান ছেড়ে দেন। তবে তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছেন। 

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিথুন আলমগীর বলেন, “একটি ডিসকাউন্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টির শুরু হয়। প্রথমে সেটি করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কাগজটি ফেরত এলে প্রথমে বিভাগীয় ও পরবর্তীতে শৃঙ্খলা কমিটির তদন্তের পর দেখা যায় এতে সাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশ মতো কলেজের নিয়ম অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়।” 

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জাইদা রহমান বলেন, “শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশের পর অধ্যক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর ডা. রফিক শাস্তিপ্রাপ্তদের পক্ষে আমাদের কাছে এসে অসদাচরণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরই এই কর্মসূচির খবর এলো।” এ কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমও কিছুটা ব্যহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে চিকিৎসকদের একাংশের কর্মসূচিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ চিকিৎসাপ্রার্থীরা। 

জাহানারা বেগম নামে এক নারী এসেছেন মানিকগঞ্জ থেকে। তিনি বলেন, “বাচ্চার শ্বাসকষ্ট। ডাক্তার নাই। চিকিৎসা দিবে না বলছে। এখন চলে যাচ্ছি।” 

   

About

Popular Links

x