Wednesday, July 08, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পাঁচ দশকে রাজশাহী অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪%

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে কমছে বৃষ্টিপাত

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:১৫ এএম

গত পাঁচ দশকে রাজশাহীতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪%। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বদলে যাওয়া এক জলবায়ুর কঠিন বাস্তবতার ইঙ্গিত। একই সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা, গভীর হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এর চাপ সরাসরি আঘাত করছে কৃষি, জীবিকা ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তরে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটারে গত এপ্রিলে প্রকাশিত “এক্সট্রিম ক্লাইমেট অ্যান্ড হাইড্রোক্লাইম্যাটিক মডেলিং অব ওয়াটার স্ট্রেস: ইমপ্লিকেশনস ফর লাইভলিহুডস ইন রাজশাহী, বাংলাদেশ” শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। 

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে রাজশাহীতে পানির ওপর চাপ বেড়ে চলেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সাল নাগাদ জেলার অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি থেকে তীব্র পানি-সংকট দেখা দিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল পরিচালনা করেছে এই গবেষণা।  রাজশাহী অঞ্চলের ১৩টি উপজেলার তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৩৮৫টি পরিবারের ওপর করা হয় মাঠ জরিপ।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮-৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে গড় মৌসুমি বৃষ্টিপাত ছিল ১,৪০৬ মিলিমিটার; কিন্তু ২০১১-২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ প্রায় ৪৮১ মিলিমিটার বা ৩৪% কমেছে বৃষ্টিপাত। 

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে কমছে বৃষ্টিপাত।

এ অঞ্চলের তাপমাত্রার চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষের আগেই রাজশাহীতে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা একাধিকবার রেকর্ড হতে পারে। এমনকি ২০৮৮ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৭.১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ২০১৮ সালে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিন ছিল মাত্র ১৩টি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৭৮ সালের মধ্যে তা প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে, অর্থাৎ বছরের অর্ধেকের বেশি সময় তীব্র গরমে কাটাতে হতে পারে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গত ৩৫ বছরে বরেন্দ্র এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছে গড়ে ৩.৭৮ মিটার। ১৯৯০ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ১১ .৬৬ মিটার নিচে। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৫.৪৪ মিটারে পৌঁছেছে। কৃষি সেচের জন্য গভীর নলকূপনির্ভরতা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক পানি উত্তোলনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এ পতনের প্রধান কারণ হিসেবে।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহর ভাষায়, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে মাটির আর্দ্রতা কমছে, সবুজায়ন কমছে এবং মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে পানি। “তানোরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এখন তীব্র পানি-সংকট। যাদের সামর্থ্য আছে তারা সাবমার্সিবল ব্যবহার করে পানি তুলছেন; কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অন্যের কাছ থেকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে পানি কিনে ব্যবহারকারী পরিবারগুলোকে মাসে গড়ে প্রায় ১,৮৩০ টাকা ব্যয় করতে হয়, যা তাদের আয়ের বড় একটি অংশ”- বললেন তিনি।

এ সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা পানিসাশ্রয়ী সেচপ্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির কৃত্রিম পুনর্ভরণ, অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং খরাসহিষ্ণু ফসল চাষ সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি পুকুর, খাল ও বিল পুনর্খননের মাধ্যমে উপরিভাগের পানি ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. মজিদুল ইসলাম বলেন, ৩০ বছর আগে এ এলাকার মানুষ পুকুরের পানি পান করতেন। সরকারের ভুল নির্দেশনার কারণে পুকুর-বিল সব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখন খাওয়ার পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন “পরিবর্তন”-এর প্রধান নির্বাহী রাশেদ ইবনে ওবায়েদ রিপনের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় আরো তীব্র হয়েছে সংকট। একসময় রাজশাহী শহরে প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও জলাশয় থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ২০০-এর নিচে। খরা মোকাবিলা ও স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বড় জলাশয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত; কিন্তু এসব জলাশয় ভরাট হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের ৪২টি ইউনিয়নকে পানির জন্য অতিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, “বিগত বছরগুলোর তুলনায় রাজশাহীতে এবার বৃষ্টিপাত অনেক কম। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হচ্ছে। কেননা রাজশাহীতে যে পরিমাণ গাছ লাগানো হচ্ছে, তার চেয়ে কাটা হচ্ছে বেশি। নদীর নাব্যও কমেছে। সব মিলিয়ে জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, “বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে দেশে বৃষ্টিপাত কমেছে।”

পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১,৪৬৯টি মৌজা “অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন”, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা “উচ্চ পানিসংকটাপন্ন” এলাকা এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১,২৪০টি মৌজা “মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন” এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত ২২ জানুয়ারি এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এরপর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এ এলাকাকে “পানিসংকটাপন্ন” এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খাওয়ার জন্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা আগামী দুই বছরের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, পানিসংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকার আয়তন ২, ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার; যেখানে  ২১ লাখের বেশি মানুষ মানুষ পানিসংকটে ভুগছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যাতে আগের জায়গায় ফিরে আসে, সে জন্য বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির যত রকম রিসোর্স (উৎস) আছে, সব কটি কাজে লাগাতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, কোনোভাবেই যেন ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় না হয়। 

   

About

Popular Links

x