Sunday, July 26, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও উত্তেজনা

ফার্মাসিউটিক্যালসে ভাঙচুর, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ এএম

ঢাকার সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যেকার বিরোধ আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। আদালতের সাম্প্রতিক একটি আদেশের ব্যাখ্যা নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

শনিবার (২৫ জুলাই) গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসে ভাঙচুর, সিসিটিভি ক্যামেরা ও একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি এক নিরাপত্তাকর্মীকে মারধরের ঘটনা ঘটে।

বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের অভিযোগ, ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ কয়েক শ লোক নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাভার ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার পর এসব ঘটনা ঘটে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ। তার দাবি, আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। তার সঙ্গে থাকা কেউ ফার্মাসিউটিক্যালস এলাকায় যাননি। বরং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের লোকজন নিজেরাই ভাঙচুর চালিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।

জানা গেছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাস্টি বোর্ডের বৈধতা নিয়ে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এবং বর্তমান কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ সংক্রান্ত বিষয় বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।

এ বিরোধের মধ্যে গত ৫ জুলাই বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ তিনটি সম্পূরক নিবন্ধিত দলিলের কার্যকারিতা চার মাসের জন্য স্থগিত করেন। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে রুল জারি করা হয়।

বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের দাবি, ওই আদেশের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ৩০০ থেকে ৩৫০ জন লোক নিয়ে সাভার ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের ভাষ্য, মামলার এখনো পূর্ণাঙ্গ শুনানি হয়নি এবং আদালতের আদেশও চূড়ান্ত নয়।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিচালক (ভূমি প্রশাসন) মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, “সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও তার সঙ্গে আসা লোকজন ফার্মাসিউটিক্যালসে প্রবেশ করে সিসিটিভি ক্যামেরা ও একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন এবং এক নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যান।”

আবদুস সালামের দাবি, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর নাজিমউদ্দিন আহমেদ নিজেকে চেয়ারম্যান দাবি করেন জোরপূর্বক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার কাছে আর্থিক হিসাব চাইলে তিনি তা দিতে না পেরে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি আলাদা একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন, যা নিয়ে আদালতে মামলা হয়।

তিনি আরও বলেন, “মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত নাজিমউদ্দিনকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশাসনিক, আর্থিক বা অন্য কোনো কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন করলেও সেটির নিষ্পত্তি হয়নি। তা সত্ত্বেও তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রবেশ করে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।”

আবদুস সালাম জানান, দখলচেষ্টার আশঙ্কায় আগের রাতেই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন শিরীন হক বলেন, “ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকেই সাবেক ট্রাস্টি সদস্য ডা. নাজিমুদ্দিন প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে আসছেন।”

তিনি অভিযোগ করেন, ওই ব্যক্তি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, যা সুদে আসলে ১০ কোটি টাকা হয়ে গেছে। সেই অর্থ পরিশোধ এড়াতেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তার আরও দাবি, দায়িত্ব পালনকালে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ অপচয় ও তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনায়ও অনিয়মও হয়েছে।

শিরীন হক বলেন, “আদালতের আদেশের একটি অনানুষ্ঠানিক কপি তারা পেয়েছেন। ওই আদেশে পূর্ণাঙ্গ শুনানির আগে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু নাজিমউদ্দিন আহমেদ কর্মীদের কাছে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন যেন আদালত তাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন।”

তিনি আরও দাবি করেন, শনিবার নাজিমউদ্দিন আহমেদ কয়েকশ লোক নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং পরে তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলে।

শিরীন হক বলেন, “ঘটনার বিষয়ে তারা আদালতের শরণাপন্ন হবেন। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই তারা মেনে নেবেন।”

নাজিমউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বে বসেন। তবে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট তোপের মুখে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন তিনি।

নাজিমউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আদালতের একটি আদেশের ভিত্তিতে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। ১৯৭২ ও ১৯৮০ সালের দলিল অনুযায়ী তিনি প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ দায়িত্বে ও স্বত্বাধিকারী। প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেই তিনি সেখানে প্রবেশ করেন।”

তার দাবি, আদালতের আদেশে চার মাসের জন্য অবৈধ দলিলগুলো স্থগিত করা হয়েছে এবং ১৯৭২ ও ১৯৮০ সালের দলিল অনুযায়ী তিনি হাসপাতালের দায়িত্বে রয়েছেন।

তিনি বলেন, “শনিবার হাসপাতালে প্রবেশের পর দেখেন রোগীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পরদিন থেকে ২৫০ টাকা ফিতে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।”

তার দাবি, সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। অনেক সময় রোগীদের আশপাশের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে সেখানেই একই চিকিৎসকেরা অপারেশন করেন।

নাজিমউদ্দিন বলেন, “পরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসে ‘উপরের নির্দেশ’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলেন। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রেফারেন্স দেওয়া হলেও ওই নির্দেশনা কে দিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে তিনি পরদিন আবার আসবেন বলে সেখান থেকে চলে যান।”

রায়ের কপি পাওয়ার বিষয়ে নাজিমউদ্দিন জানান, তিনি গত ৫ জুলাই রায় পেয়েছেন। প্রশাসন ও পুলিশকে রায়ের কপি দেখানোর পর হাসপাতালে প্রবেশে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।

ফার্মাসিউটিক্যালসে ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করে নাজিমউদ্দিন জানান, তার পক্ষের কেউ সেখানে যাননি। ফার্মাসিউটিক্যালসের লোকজন নিজেরাই ভাঙচুর করে পরে তার নামে অভিযোগ করেছেন।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “ডা. নাজিমউদ্দিন দলবল নিয়ে গণস্বাস্থ্যে এসেছিলেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে দুপুরের পরপরই চলে যান।”

গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসে ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, “একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ও দুটি কাচ ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনার জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে। এ ঘটনায় এখনও কোনো পক্ষই মামলা করেনি।”

   

About

Popular Links

x