Monday, July 27, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান একরামের স্ত্রী আয়েশা

একরাম হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।

রবিবার (২৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, "আমি বিচার চাই, আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমার স্বামী একরাম হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামির বিচার চাই। সাবেক এমপি বদির কেড়ে নেওয়া আমার পিতার জমিও ফেরত চাই।”

ট্রাইব্যুনালের আদেশ ও পরবর্তী দিনক্ষণ

আদালত রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি আমলে নিয়ে পলাতক থাকা শেখ হাসিনাসহ মোট আটজন আসামির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা ৩ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ২৫ আগস্ট। প্রসিকিউশন পক্ষ জানিয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ, অপহরণ, নির্যাতন এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

হাইপ্রোফাইল আসামিদের তালিকা

তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু স্থানীয় পরিকল্পনাকারীদেরই নয়, বরং এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। শেখ হাসিনা ও আবদুর রহমান বদি ছাড়াও এই মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন—আসাদুজ্জামান খান কামাল (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), ওবায়দুল কাদের (সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), বেনজীর আহমেদ (সাবেক আইজিপি ও র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম (র‍্যাবের তৎকালীন লেফটেনেন্ট কর্নেল), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন (র‍্যাবের তৎকালীন লেফটেনেন্ট কর্নেল), কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান (র‍্যাবের তৎকালীন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা), মেজর (অব.) রুহুল আমিন (র‍্যাব-৭ এর তৎকালীন কর্মকর্তা), স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ (র‍্যাব-৭ এর তৎকালীন কর্মকর্তা), কমান্ডার মো. আশেকুর রহমান সৈকত (র‍্যাব-৭ এর তৎকালীন কর্মকর্তা)।

আসামিদের বর্তমান আইনি অবস্থা

গ্রেপ্তার আসামি (৩ জন): আবদুর রহমান বদি, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম বর্তমানে অন্য মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে (শোন অ্যারেস্ট) আগামী ২৫ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও পলাতক আসামি (৮ জন): শেখ হাসিনাসহ বাকি আটজন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন এবং ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগমের আকুতি

আট বছর ধরে চোখের জল ফেলা আয়েশা বেগম বুকভরা আর্তনাদ নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “২০১৮ সালের সেই কালরাতের পর থেকে আমাদের জীবনটা থমকে গেছে। দুই মেয়েকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা আর অর্থকষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছি। খুনিরা শুধু আমার স্বামীকে কেড়ে নেয়নি, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমাদের পৈত্রিক জমিজমা ও সম্পত্তি জবরদখল করে নিয়েছে। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের জমি ফেরত দিতে ট্রাইব্যুনাল যেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন, এটাই এখন আমার শেষ চাওয়া।”

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৬ মে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের নোয়াখালীয়া পাড়া এলাকায়। ঘড়িতে তখন গভীর রাত। একটি ফোন কল, যা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো বাংলাদেশকে। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সেদিন বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হকের প্রাণ। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে নিহত একরামের ফোনটি চালু ছিল। ওপাশে লাইনে যুক্ত ছিলেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম এবং তাদের দুই সন্তান। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা সেই কথোপকথন কোনো সাধারণ অডিও নয়; তা ছিল একটি পরিবারের বুক ফাটানো আর্তনাদ এবং একটি রাষ্ট্রীয় নির্মমতার জীবন্ত দলিল।

ওইদিন কাউন্সলর একরাম নিহত হওয়ার পর একটি অডিও রেকর্ড কল দেশের সব বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। “আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে?”—মেয়ের এই প্রশ্নে ফোনের ওপাশে বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “না আম্মু, আমি কাঁদছি না।” ২০১৮ সালের সেই রাতে এটিই ছিল কক্সবাজারের টেকনাফের সাবেক কাউন্সিলর একরামের শেষ কথা। সেদিন রাতে স্ত্রী আয়েশা বেগমেরও কথা হয় নিহত একরামের সঙ্গে। মোবাইলের অডিও রেকর্ডে স্ত্রী আয়েশা বেগমের আকুতি, “ও আল্লাহ! তোমরা ওরে কী করলা? হ্যালো...হ্যালো...!” ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসছিল বুটের শব্দ, গাড়ির দরজা খোলার আওয়াজ এবং কিছু কর্কশ নির্দেশ। “আমি কোনো অন্যায় করি নাই”—একরামের এই শেষ আকুতি ঢাকা পড়ে যায় বুলেটের নিষ্ঠুর শব্দে। এরপর শুধু দুটি গুলির শব্দ আর এক মায়ের বুক ফাটানো আর্তনাদ। দীর্ঘ আট বছর আগে বন্দুকযুদ্ধের নামে ধামাচাপা থাকা সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশায় নিহত একরামের পরিবার। বিচার হয়তো হবে, কিন্তু তা কী পারবে বাবার সেই শেষ ডাক ফিরিয়ে দিতে?

আয়েশা বেগমের সেই বুক ফাটানো চিৎকার আর দুই শিশুর কান্নায় সেদিন টেকনাফের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। একটি সাজানো গল্প দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এই হত্যাকাণ্ডকে। সেই থেকে দীর্ঘ ৮ বছর অসহায় পরিবারটির চোখে ঘুম নেই। পড়ে আছে জরাজীর্ণ বাড়িটি। মামলা জটিলতা ও জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ঠিকমতো বাড়িতে থাকা হয়ে ওঠেনি নিহত একরামের দুই সন্তান ও স্ত্রী আয়েশা বেগমের। গা ডাকা দিয়ে আছেন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায়।

সেই অডিও রেকর্ড ও বিশ্বব্যাপী তোলপাড়

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালিয়া পাড়ায় র‍্যাব-৭ এর একটি দল একরামুল হককে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে। তবে হত্যাকারীরা জানত না যে, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও একরামের মোবাইল ফোনটি সচল ছিল এবং তার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে লাইনে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে সেই ফোনে রেকর্ড হওয়া কথোপকথন, একরামের গোঙানি, মেয়ের আকুতি এবং র‍্যাব সদস্যদের নির্মম গুলির শব্দসহ একটি অডিও রেকর্ড ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। এই রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার জেরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে র‍্যাবের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

সাবেক কাউন্সিলর একরাম নিহতের দীর্ঘ ৮ বছর পর গত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে একরামের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের আশায় মামলা দায়ের করে। 

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সাবেক এমপি বদি

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের জানান, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন টেকনাফের সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। তদন্তে উঠে এসেছে, একরামুল হক স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং জনপ্রিয় নেতা হওয়ায় তিনি বদির একচ্ছত্র আধিপত্যের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া একরামের পরিবারের মালিকানাধীন কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার একটি সুগভীর নীলনকশা ছিল বদির। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ইন্ধন ও ব্যক্তিগত স্বার্থে র‍্যাবকে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়ন করা হয় এবং পরবর্তীতে একরামের জমি বিভিন্ন কৌশলে ও ক্ষমতার জোরে আত্মসাৎ করা হয়। বদি বর্তমানে অন্য একটি মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন এবং এই মামলাতেও তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে, দীর্ঘ ৮ বছরের লড়াইয়ের পর ট্রাইব্যুনালে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়াকে দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন একরামের পরিবার। তারা চেয়ে আছেন ২৫ আগস্টের দিকে, যেদিন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উঠবে এই নৃশংসতার জবাবদিহিতা।

   

About

Popular Links

x